এলকেএসএসকে ঘিরে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়, তদন্তে বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারকে ঘিরে নানা ধরনের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনবল গঠনের কথা বললেও এখন অভিযোগ উঠেছে, এসবের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল নথি ব্যবহার, কর ফাঁকি এবং কর্মীদের অর্থ আত্মসাতের মতো অনিয়ম চলেছে।

এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে বর্তমানে তদন্ত চলছে, যার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম-মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এলকেএসএস-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে অসংখ্য অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির নাম ব্যবহার, জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ, প্রকল্প সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে।

সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো—লাইসেন্স ছাড়া আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহ। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এলকেএসএস সেই লাইসেন্স না পেয়েও লাইসেন্সের আবেদনের ফটোকপি ব্যবহার করে টেন্ডারে অংশ নিয়েছে এবং প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এইভাবে প্রতিষ্ঠানটি হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারি প্রকল্পের কাজ নিয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে বড় অভিযোগ। অনেকের দাবি, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ না দিয়ে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট কিছু লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একটি অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেনের চক্র গড়ে ওঠে, যেখানে নিয়োগ পেতে অর্থ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এসব বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে বিষয়গুলো চাপা পড়ে গেছে।

লাইসেন্সের বিষয়টিও বেশ জটিল। জানা গেছে, ২০১৮ সালে এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে জমা দেওয়া কাগজপত্রে অসত্য তথ্য পাওয়ায় সেই আবেদন বাতিল করা হয়। তারপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং টেন্ডার পেয়েছে—যা বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্যাক্স ও ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ টিন বা ভ্যাট সনদ ছিল না। অথচ তারা ভুয়া নথি ব্যবহার করে কাজ নিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৫৬০০ কর্মীর বেতনের বিপরীতে যে ভ্যাট-ট্যাক্স সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ জমা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অথচ টিন সনদ নেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালে এবং ভ্যাট নিবন্ধন করা হয়েছে ২০২৫ সালে—যা আগের কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো কর্মীদের অর্থ আত্মসাৎ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কর্মীর জন্য এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট হিসাবে জমা রাখার কথা, যা চাকরি শেষে ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ জমা না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

নথি জালিয়াতির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন টেন্ডারে জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করে সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রমাণিত হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে সিরাজগঞ্জের হাটিকামরুল এলাকায় জমি ক্রয়, ভবন নির্মাণ এবং একটি রেস্টুরেন্ট প্রকল্প নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির প্রকল্পের টাকা ব্যবহার করে সেখানে অবকাঠামো তৈরি করা হয় এবং পরে সেটি ভাড়া দেওয়া হয়। ভাড়ার অগ্রিম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাগাভাগি করে নেন। পরে সরকার ওই জায়গা অধিগ্রহণ করলে প্রায় সাড়ে তের কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যা সরকারি তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। বিষয়টি সরকারি অর্থ তছরুপের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই পুরো ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠছে—এলকেএসএস কি সত্যিই জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম? কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।

তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে কাউকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। তাই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং দ্রুত তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

 

  • Related Posts

    দিলীপ আগরওয়ালাকে ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ

    বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিতে আহত এক শিক্ষার্থীর করা হত্যাচেষ্টা মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। এর আগে এ মামলায় তাকে…

    শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের পরও বহাল বিতর্কিত কর্মকর্তারা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। কিন্তু এই অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় গুরুত্বারোপ রাষ্ট্রপতির

    টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় গুরুত্বারোপ রাষ্ট্রপতির

    ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্ট মার্টিন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 7 views
    ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্ট মার্টিন

    কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই, কেন আমার ওপর হামলা হলো: টাইগার শ্রফ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 7 views
    কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই, কেন আমার ওপর হামলা হলো: টাইগার শ্রফ

    স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    নিজের গাড়িতে গুলির ঘটনায় মামলা করলেন আসিফ আকবর

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 8 views
    নিজের গাড়িতে গুলির ঘটনায় মামলা করলেন আসিফ আকবর

    সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি চীনের প্রথম সিনেমা মুক্তি পেল

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 8 views
    সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি চীনের প্রথম সিনেমা মুক্তি পেল