ইলিয়াস আলীর লাশ ফেলা হয় ধলেশ্বরীতে

image_pdfSaveimage_print

ডেস্ক নিউজঃ সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসছে বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে দায় চাপাচ্ছেন অন্যদের উপর। তবে তিনি বিএনপি নেতাকে গুম, নেপথ্য, কারা জড়িত এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। ডিবি তার দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই করছে।

শেখ মামুন খালেদ গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, গুম করার সংকেত আগেই দেয়া হয়েছিল। ইলিয়াস আলী টিপাইমুখ বাঁধ এবং পার্শ্ববর্তী একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই বাঁধ ও চুক্তি ওই দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইলিয়াস আলী এর বিরুদ্ধে গিয়ে আন্দোলনও করেছিলেন। এরপরই সরকারের রোষানলে পড়েন। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইলিয়াস আলীকে সরিয়ে দেয়া হয়। শেখ হাসিনা তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও র‌্যাব’র মহাপরিচালকে গুমের মিশন বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা দেন। গুমের পুরো প্রক্রিয়া রেকি ও বাস্তবায়ন করে র‌্যাব-১। আর র‌্যাবকে সহযোগিতা করে ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তা। সবচেয়ে বড় ভূমিকা ও ইলিয়াস আলী গুম মিশনের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।

শেখ হাসিনা ঘটনার আগে পরে জিয়াউলের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে বনানী থেকে গুম করে নেয়া হয় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে। সেখানে ইলিয়াসকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে মারধর করা হয়। গোয়েন্দাদের সূত্র জানিয়েছে, তুলে নেয়ার পর ১৭ থেকে ২০শে এপ্রিলের কোনো এক রাতে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হতে পারে।

অন্যদিকে গুম হওয়া স্বামীর সন্ধান চেয়ে ২১শে এপ্রিল ইলিয়াসপত্নী সন্তানদের নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। পরে শেখ হাসিনা জিয়াউল আহসানকে ফোন দিলে ইলিয়াস আলীকে চূড়ান্ত গুম করার ইঙ্গিত দেন ওই কর্মকর্তা।

এদিকে সরকারের নির্দেশনায় ইলিয়াস আলীকে গুম করা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার ৫ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে ফের সাতদিনের রিমান্ড চান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। আদালত আবার তার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন খালেদ জানান, ইলিয়াস আলীকে গুম করার জন্য কাজ করে ডিজিএফআই ও র‌্যাব’র একটি বিশেষ টিম। তাদের আগে থেকেই ব্রিফ করে তৈরি করা হয়েছিল। সার্বিকভাবে দিকনির্দেশনা মামুন খালেদ নিজেই দিয়েছিলেন।

ইতিমধ্যে আলোচিত এই গুম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর গুমের সঙ্গে জড়িত র‌্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সকল সদস্যকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদিও তাদের কেউ কেউ দেশত্যাগ করেছেন। কেউ আগেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ অবসরে গেছেন। অনেকেই এখনো চাকরিতে বহাল তবিয়তে আছেন। মামুন খালেদ জানিয়েছেন, ইলিয়াস আলী গুম মিশনে ডিজিএফআইতে কর্মরত দু’জন মেজর প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিলেন। আর ইলিয়াস গুমের বিষয়ে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপদধারীরা অবগত ছিলেন।

গুমের স্বীকার বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন নাকি তাকে মারা হয়েছে এমন প্রশ্ন চৌদ্দ বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে তার কর্মী, সমর্থক ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারেনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তো উত্তর মিলেনি বরং ওই সময় ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে কোনো তদন্তই হয়নি বলে দাবি করেছেন তার পরিবার ও বিএনপি। একটি পক্ষ আগেই ধারণা করেছিলেন ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে। আর আরেকটি পক্ষ মনে করতেন ইলিয়াস বেঁচে আছেন এবং তিনি ফিরবেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিজিএফআই নিয়ন্ত্রণাধীন আয়নাঘর খ্যাত বন্দিশালা থেকে গুমের শিকার অনেকেই মুক্তি পান। তখনো ইলিয়াস আলী ফিরেননি। এরপর থেকে তার ফিরে আসার আশা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে আসে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনাও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, আমার স্বামী ইলিয়াস আলী কোথায়?

তদন্ত সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে সন্ধ্যার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইলিয়াস আলী তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল) বসে মিটিং করছিলেন। রাত ১১টার দিকে তিনি নেতাকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন থেকেই তাকে অনুসরণ করছিল জিয়াউল আহসানের গুম স্কোয়াডের এক সদস্য। তিনি একটু পর পর ইলিয়াস আলীর গাড়ির অবস্থান জিয়াকে জানিয়ে দেন। মহাখালী পৌঁছার পর ইলিয়াস আলীর গাড়ি সরাসরি অনুসরণ শুরু করে জিয়ার টিম। মহাখালী থেকে বনানীর ২ নম্বর সড়কে যাওয়ার পর গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর পর ড্রাইভার আনসারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে এই টিমের সদস্যরা। তারপর সেখান থেকে নেয়া হয় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে।

  • Related Posts

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। গত কয়েক দিন…

    ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত

    ডেস্ক নিউজ : সৌদি আরবে বিমানবন্দরে হুতি হামলার প্রেক্ষাপটে যাত্রীদের নিরাপত্তায় ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে জরুরি প্রয়োজনে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত

    • By Sara
    • অক্টোবর ১৫, ২০২৬
    • 16 views
    ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত

    বাংলাদেশের নদীপথে ভারতের নতুন বাণিজ্যযাত্রা

    • By Sara
    • অক্টোবর ১৫, ২০২৬
    • 12 views
    বাংলাদেশের নদীপথে ভারতের নতুন বাণিজ্যযাত্রা