সাড়ে ১৬ কোটি টাকার ৪ তলা ভবন নিয়ে তোলপাড়, বান্দরবানে হর্টিকালচার সেন্টারে অনিয়মের অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বান্দরবানের বালাঘাটা এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে নির্মাণাধীন একটি ৪ তলা “ল্যাবরেটরি কাম অফিস” ভবনকে ঘিরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের তদারকিতে গাফিলতি এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, যে ধরনের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসাজশের কারণেই কাজের মান ঠিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ সময় প্রকল্প এলাকায় দেখা যায় না। বরং ঢাকায় বসে মোবাইল ফোনের ভিডিও কলের মাধ্যমে নির্মাণকাজ তদারকি করা হচ্ছে। এতে করে বাস্তবে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে বা কাজের গুণগত মান কেমন, সেটি সঠিকভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের বিভিন্ন অংশে এখন টাইলস, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্যানিটেশন, ইন্টারনেট লাইন ও পাইপ ফিল্টারের কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রেও কমদামি ও নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনের ফ্লোর ভরাটে বালির পরিবর্তে পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নিম্নমানের ইট, খোয়া, বালি ও পাথর দিয়েই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভবনের রড ব্যবহারের বিষয়ে। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ওয়ার্ক অর্ডারে পিলারে ১৫ এমএম রড ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় ৪ বা ৫ সুতা রড ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময় ধরে লোড টেস্ট করার কথাও ঠিকভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের অনেকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব সামগ্রী দিয়েছে, সেগুলো দিয়েই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

স্থানীয় অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের অনেকে বলছেন, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ৪ তলা একটি ভবন নির্মাণে সাধারণত ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। সেখানে এই প্রকল্পে সাড়ে ১৬ কোটির বেশি টাকা ব্যয় দেখানোয় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের ধারণা, অতিরিক্ত বাজেট দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শনে আসা কর্মকর্তাদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের খরচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে। এমনকি কাজের মান ভালো হয়েছে বলে রিপোর্ট দেওয়ার জন্যও প্রভাব খাটানো হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে প্রকল্পে প্রকৃত মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নির্মাণকাজ চলাকালে প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো প্রকৌশলীকে পাওয়া যায়নি বলেও জানা গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগ না থাকায় একটি বেসরকারি কনস্ট্রাকশন ফার্মের মাধ্যমে পুরো কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইরের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত যান না। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত স্বাধীনভাবে কাজ পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কারণেই তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।

ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তালহা জুবাইর সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বান্দরবান নয়, দেশের আরও কয়েকটি জেলাতেও একই ধরনের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

  • Related Posts

    কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসে সহকারী কমিশনার অনিককে ঘিরে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, কথিত দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের দাবি

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর ঢাকা আইসিডি কমলাপুর কাস্টম হাউসে কর্মরত সহকারী কমিশনার মো. আসিফ আহমেদ অনিককে ঘিরে ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং কথিত দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি,…

    ধানমন্ডি ৩২-এর ই/এম দায়িত্বে প্রায় ১০ বছর, কথিত সম্পদের পাহাড়—আবুল বাশারের বিরুদ্ধে দুদকের তথ্য তলব, নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার নথিও সামনে

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশারকে ঘিরে উঠেছে অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের একের পর এক গুরুতর…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    চলতি মাসেই বিদায় নেবে বর্ষা, হতে পারে ঘূর্ণিঝড়

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১, ২০২৬
    • 11 views
    চলতি মাসেই বিদায় নেবে বর্ষা, হতে পারে ঘূর্ণিঝড়

    দুই ছক্কা হজমের পর সাইমকে ফেরালেন মুস্তাফিজ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১, ২০২৬
    • 12 views
    দুই ছক্কা হজমের পর সাইমকে ফেরালেন মুস্তাফিজ

    দক্ষ জনশক্তি, অভিবাসন ও বিনিয়োগে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা চাইলেন রাষ্ট্রপতি

    দক্ষ জনশক্তি, অভিবাসন ও বিনিয়োগে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা চাইলেন রাষ্ট্রপতি

    শুটিং সেটে দুর্ঘটনার শিকার অমিতাভ, আঘাত নিয়েই চালালেন সঞ্চালনা

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১, ২০২৬
    • 4 views
    শুটিং সেটে দুর্ঘটনার শিকার অমিতাভ, আঘাত নিয়েই চালালেন সঞ্চালনা

    ফেনী পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

    ফেনী পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

    বদনজর থেকে বেঁচে থাকার দোয়া

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১, ২০২৬
    • 7 views
    বদনজর থেকে বেঁচে থাকার দোয়া