নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার মালিক! কর বিভাগের কর্মচারীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ কর বিভাগে নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকুরীতে প্রথম যোগদান করেন ২৩ মে ১৯৯৩ সালে। একই বিভাগে ৭ বছর চাকরি করার পর ১০ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে অফিস সহায়ক ( পিয়ন ) পদে প্রথম পদোন্নতি পান। একটানা একই বিভাগে ২৫ বছর চাকরি করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীন “অফিস সহকারী কাম কমপিউটার মুদ্রাক্ষরিক ” পদে ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং তারিখে দ্বিতীয় পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি কর অঞ্চল – ৩, সার্কেল – ৫৯, পুরানা পল্টন ঢাকায় নিয়মিত চাকরি করে যাচ্ছেন। উনার বর্তমান মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে ২২,৪৯০ টাকা।

জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ভূয়া ঠিকানায় চাকরি নিয়েছেন মর্মে অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত ও প্রমান আসে। উনার সম্পর্কে বিভিন্ন ভাবে অনুসন্ধান করে জানা যায় তিনি সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাগজ-পত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা মানিকগঞ্জ জেলা দেখিয়ে সরকারী চাকরি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ী করনের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনে তিনি ঘুষের মাধ্যমে পুলিশকে ম্যানেজ করে মানিকগঞ্জের ভূয়া স্থায়ী ঠিকানাকে সঠিক স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে পুলিশ তদন্ত রিপোর্টটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়ান।সংশ্লিষ্ট দপ্তর পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী উনার চাকরি স্থায়ী করন করেন।

জুলহাস উদ্দিন সম্পর্কে মানিকগঞ্জ জেলায় অনুসন্ধান চালানো হলে তার কোন স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের হাতের তথ্য-উপাত্ত ও খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, উনার সঠিক স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম / রাস্তা ৯৯৯, ডাকঘর – সুলতানপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, জেলা – ব্রাহ্মণবাড়িয়া। যাহা উনার এন আই ডি পূর্বের নাম্বার ১৯৭৩২৬৯৩৬২৫৬৮৮৭২৯ এবং বর্তমান স্মার্ট কার্ড নাম্বার ৬৪০০৭১৫১২১ অনুযায়ী সত্যতা পাওয়া যায়।

এসব করে এখানেই তিনি ক্ষ্যান্ত হননি, চাকরি চলাকালীন অবস্থায় নিয়মিত ভাবে সরকারের সাথে প্রতারণা করেই যাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক সরকারী কর্মকর্তা – কর্মচারীদের আয়কর রির্টান জমা বাধ্যতামূলক করেছে । নতুন TIN ( ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টি নাম্বার ) যখন অনলাইন থেকে বের করা হয়। সেক্ষেত্রে ফরম পুরনের সময় পেশা সরকারী চাকুরীজীবি এবং কর্মস্থল ঢাকা দেখালে সয়ংক্রিয় ভাবে কর অঞ্চল – ৪ অন্তর্ভুক্ত হবে। এই কর অঞ্চলেই ঢাকায় অবস্থানরত সকল সরকারী চাকুরীজীবি আয়কর রির্টান জমা করে থাকেন। কিন্তু জুলহাস উদ্দিন আহমেদের ৩৪ বছর ধরে নিজের কর্মস্থল কর অঞ্চল – ৩ হওয়ায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে লাগাতার একই জায়গায় চাকরি করে যাচ্ছেন। সব নিয়ম যেন তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু তিনি সরকারকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে নিজের রাজ্য কর অঞ্চল -৩, সার্কেল – ৬২ থেকেই নতুন TIN অনলাইন থেকে বের করেন। সব অনিয়ম তার কাছে এখন নিয়মে পরিনত হয়েছে। দেখার যেন কেউ নেই।

সরাসরি সাক্ষাৎকারে উনার কাছে ভুয়া ঠিকানা ও এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার ভুল হয়েছে। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, উনার TIN সার্টিফিকেট যাচাই করে দেখা যায় রাজধানী ঢাকাতেও উনার একটি স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে উনার স্থায়ী ঠিকানা হলো ৩ টি। প্রশ্ন থেকে যায় – একই ব্যাক্তির স্থায়ী ঠিকানা কয়টি হতে পারে ? মুলত এর ভিতরে রহস্য কি ?

হ্যাঁ গভীরে আরো রহস্য লুকিয়ে আছে। জুলহাস উদ্দিন আহমেদের ভূয়া ঠিকানায় চাকরি, সরকারের সাথে প্রতারণা ও একাধিক স্থায়ী ঠিকানার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে এলো। তিনি গোপনে গড়েছেন টাকার পাহাড় ও নামে বেনামে সম্পদের পাহাড়।

ঢাকার স্থায়ী ঠিকানার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায় – খিলগাও দক্ষীন বনশ্রী মেইন রোড এইচ ব্লকে বাড়ি নং – ৩ তার নিকট আত্তীয়ের নামে কিনেছেন কোটি টাকার ফ্ল্যাট। তার সঠিক স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সুলতানপুরে তার নিজের নামে ও ভাইদের নামে গড়েছেন রাজকীয় প্রাসাদ। এবং বাড়ির ভিতর রয়েছে অভিজাত ফার্নিচার। নিকট আত্তীয় স্বজনের নামে কিনেছেন প্রচুর জায়গা জমি। ৭ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তার সবচেয়ে ছোট ভাইকে পাঠিয়েছেন আমেরিকার টেক্সাসে। অন্য আরেক ভাইকে পাঠিয়েছেন সৌদিআরবে। জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ২ মেয়ে ১ ছেলের পিতা। ছেলেকে দেশের সুনামধন্য প্রাইভেট ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করিয়েছেন। শুধু তাই নয় – সেখানে পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর বর্তমানে উনার ছেলেকে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করাচ্ছেন।

উনার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে উনাকে যখন প্রশ্ন করা হয় – ৭ বছর নৈশ প্রহরী এবং ২৫ বছর যাবৎ আপনি পিয়ন পদে চাকরি করেছেন। তখন আপনার মাসিক বেতন কত ছিল ? উত্তরে তিনি বলেন – পূর্বে অতি সামান্য বেতন থাকলেও তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার টাকায়। ছেলেকে ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটির খরচ এবং লন্ডনে পড়াশোনা করতে যাওয়ার খরচ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উনি কোন সদ উত্তর না দিয়ে রেগে যান এবং বলেন – আপনারা যা পারেন নিউজ করেন!

তার সম্পর্কে আরও বিভিন্ন ভাবে অনুসন্ধান করে প্রমান পাওয়া যায়, তিনি সুলতানপুর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খেলাধুলার অনুষ্ঠান, স্কুলের অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ডোনেশন করে বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে বসেন এবং উপহার সামগ্রী ও অনুদান বিতরন করেন। এসব বিষয়ে সরাসরি উনাকে প্রশ্ন করা হয় যে – আপনি বেতন পান ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তব চিত্রে আপনার মাসিক খরচ লাখ লাখ টাকা। বাকী টাকাগুলো আপনার কোথা থেকে আসে ? তিনি উত্তর না দিয়ে প্রতিবেদকের উপর রেগে যান।

দেশের সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের অসাধু কর্মচারী রাষ্ট্রের জন্য খুবই ভয়ংকর। তার সমস্ত অপরাধের বিষয় গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ আমলে নিবেন এবং আশাবাদী যথাযথ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যাবস্থা গ্রহণ করবেন।

  • Related Posts

    গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’: ৫০ কোটি টাকার লেনদেন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ক্ষমতার ছত্রছায়ায়

    এসএম বদরুল আলমঃ গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, সাংবাদিক দালালচক্র এবং শত কোটি টাকার দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)…

    নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ? বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমানকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং বিভাগ যেন এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. সাইদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম, প্রকল্প লুটপাট,…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    পাকিস্তানের চেয়ে ৩৪ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ

    • By Reporter
    • মে ১০, ২০২৬
    • 2 views
    পাকিস্তানের চেয়ে ৩৪ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ

    সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৫০ হাজার ৯০৪ বাংলাদেশি হজযাত্রী

    • By Reporter
    • মে ১০, ২০২৬
    • 3 views
    সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৫০ হাজার ৯০৪ বাংলাদেশি হজযাত্রী

    নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার মালিক! কর বিভাগের কর্মচারীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য

    নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার মালিক! কর বিভাগের কর্মচারীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য

    গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’: ৫০ কোটি টাকার লেনদেন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ক্ষমতার ছত্রছায়ায়

    গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’: ৫০ কোটি টাকার লেনদেন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ক্ষমতার ছত্রছায়ায়

    এসএসসির নবম দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৩১ হাজার, বহিষ্কার ৯

    এসএসসির নবম দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৩১ হাজার, বহিষ্কার ৯

    নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ বাহিনী গঠনের আদেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়

    নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ বাহিনী গঠনের আদেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়