টেন্ডার সিন্ডিকেট থেকে সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণ—গণপূর্তে ড. আবু নাসেরকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর—যে দপ্তর জনগণের টাকায় পরিচালিত হওয়ার কথা, সেটিই এখন যেন পরিণত হয়েছে এক ‘নিয়ন্ত্রিত দুর্গে’। অভিযোগ উঠেছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর অঘোষিত নির্দেশ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ কার্যত অসম্ভব।

দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে তাকে ঘিরে এখন তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক অঙ্গনজুড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক আলোচিত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবের বলয়ে রয়েছেন ড. আবু নাসের চৌধুরী। আর সেই প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে গড়ে তুলেছেন এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ উঠেছে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২ এ তার পদায়ন নিয়ে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১ কোটি টাকার বিনিময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। অথচ এর আগেই বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ওঠে ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ।

সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ ও এপিপিভুক্ত বিভিন্ন কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করা হয়েছে। একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার নামে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ভেরিয়েশন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামেও হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

অভিযোগ রয়েছে, বগুড়ায় দায়িত্বে থাকলেও সপ্তাহে দুই দিনের বেশি অফিস করতেন না ড. আবু নাসের। বাকি সময় ঢাকায় অবস্থান করে তদবির, পদ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার অনিয়মিত উপস্থিতির প্রমাণ মিলবে। তার বিপুল সম্পদের তথ্য নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট, বারিধারা ও গুলশান-২ এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরে প্রায় ২০ একর জমির মালিক তিনি। এছাড়াও নামে-বেনামে বিপুল ব্যাংক হিসাব ও অঘোষিত সম্পদের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সাংবাদিকদের প্রতি তার আচরণ।
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা খাতা চালু করা হয়েছে। সেখানে নাম, পত্রিকার পরিচয়, আগমনের কারণ, কার সঙ্গে দেখা করবেন—সব বিস্তারিত লিখে দিতে হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো সাংবাদিককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

এক ভুক্তভোগী সাংবাদিক জানান, এক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর আমন্ত্রণে অফিসে গেলেও গেটে তাকে আটকে দেওয়া হয়। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ভেতরে ঢুকতেই শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা সরাসরি জানান, ড. আবু নাসের চৌধুরীর নির্দেশ ছাড়া সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি নেই। সেই সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মনে হচ্ছিল সরকারি অফিসে নয়, কোনো গোপন সামরিক স্থাপনায় ঢুকতে গেছি। জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি সরকারি দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রবেশে এমন নজরদারি কেন ? ভয়টা কোথায় ?”

তিনি আরও জানান, শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে ফোন দেওয়ার পর আচরণ কিছুটা নরম হয়। এরপর নাম এন্ট্রি, স্বাক্ষর ও ভিজিটর কার্ড দিয়ে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাকে তিনি “অপমানজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ” বলে মন্তব্য করেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—একটি সরকারি দপ্তরে সাংবাদিক প্রবেশে এত অস্বাভাবিক কড়াকড়ির পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী? দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের তথ্য আড়াল করতেই কি এই ‘নিজস্ব আইন’ চালু করা হয়েছে?

এ বিষয়ে ড. আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি নিজেই গণপূর্তে ঢোকার নিয়ম তৈরি করেছি।” সাংবাদিকদের প্রবেশে এত কড়াকড়ির কারণ জানতে চাইলে তিনি ধমকের সুরে কথা বলে ফোন কেটে দেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক মাত্র। রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। অথচ ড. আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণ করে, তিনি যেন সরকারি দপ্তরকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত করেছেন।

অভিযোগের পাহাড়, প্রভাবের বলয়, টেন্ডার সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ সম্পদের প্রশ্ন এবং পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে অঘোষিত বাধা—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে এখন যেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক ভয়ংকর ‘দুর্গতন্ত্র’। আর সেই দুর্গের কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচিত নাম—ড. আবু নাসের চৌধুরী।

  • Related Posts

    চট্টগ্রাম বন বিভাগে দুর্নীতির ছড়াছড়ি, বনভূমি দখল আর কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তারা বিভিন্ন প্রকল্পের…

    কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়ক উঁচু করায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, ড্রেন নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসীর আবেদন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়কটি নতুন করে সংস্কার ও উঁচু করে নির্মাণ করা হলেও এতে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করা এই…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    টেন্ডার সিন্ডিকেট থেকে সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণ—গণপূর্তে ড. আবু নাসেরকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

    টেন্ডার সিন্ডিকেট থেকে সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণ—গণপূর্তে ড. আবু নাসেরকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

    পশ্চিমবঙ্গে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ করলো বিজেপি

    পশ্চিমবঙ্গে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ করলো বিজেপি

    পদ্মা ব্যারেজ আমাদের স্বার্থ, ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই: পানিসম্পদমন্ত্রী

    পদ্মা ব্যারেজ আমাদের স্বার্থ, ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই: পানিসম্পদমন্ত্রী

    ট্রেনের ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু: আজ পাওয়া যাচ্ছে ২৪ মের টিকিট

    ট্রেনের ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু: আজ পাওয়া যাচ্ছে ২৪ মের টিকিট

    নবম জাতীয় পে স্কেলের সম্ভাব্য বেতন গ্রেড প্রকাশ

    নবম জাতীয় পে স্কেলের সম্ভাব্য বেতন গ্রেড প্রকাশ

    আগামী বছর এসএসসি ও এইচএসসি কবে, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

    • By Reporter
    • মে ১৩, ২০২৬
    • 8 views
    আগামী বছর এসএসসি ও এইচএসসি কবে, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী