হামের থাবায় দিশেহারা শৈশব, ৯ মাসের কমবয়সীরা মারা যাচ্ছে বেশি

image_pdfSaveimage_print

ডেস্ক নিউজঃ হামের ভয়াল থাবায় দেশে অকালে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক নিষ্পাপ প্রাণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান জনমনে এক গভীর ও বেদনাবিধুর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, কেন নয় মাসের কম বয়সি শিশুরা হামের কাছে এভাবে হার মানছে? নিয়ম অনুযায়ী, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অধীনে এই বয়সি শিশুদের হাম-রুবেলা বা এমআর টিকা পাওয়ার কথা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, জন্মের পর অন্তত ছয় মাস মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি বা সুরক্ষার অদৃশ্য বর্ম শিশুদের এই ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করে। অথচ সেই প্রাকৃতিক বর্ম আজ যেন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সরকারি হিসাব বলছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতার কথা। দেশজুড়ে হামের উপসর্গ ও সংক্রমণে প্রায় ৪৮১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৮০ জন নিশ্চিতভাবেই হামে প্রাণ হারিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিস্তারিত বিশ্লেষণে থাকা ৬০টি মৃত শিশুর মধ্যে ২৯ জনেরই বয়স নয় মাসের নিচে। তিন মাস থেকে শুরু করে আট মাস বয়সি শিশুদের এই মৃত্যুর মিছিল জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অশনিসংকেত। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যে বয়সের শিশুদের প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকার কথা, তারা কেন এত দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে?

বিশেষজ্ঞরা এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির পেছনে মূলত মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির অভাব এবং দেশব্যাপী বিরাজমান চরম অপুষ্টিকে দায়ী করছেন। একসময় দেশে ৯৫ শতাংশ মানুষের যে শক্তিশালী ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বলয় ছিল, তা আজ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। মায়েদের অপুষ্টির কারণে শিশুরা জন্মগতভাবেই রোগ প্রতিরোধের কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার ওপর আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেক ক্ষেত্রে শালদুধ পানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

সুরক্ষার এই দেয়াল ধসে পড়ার পেছনে বিগত বছরগুলোর টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হওয়াকে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২০ সালে মহামারীর ধাক্কা এবং পরবর্তীতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ছেদ পড়ে। বন্ধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনও। এই পুষ্টি ঘাটতি এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের পুঞ্জীভূত সংখ্যাই আজকের এই বিপর্যয়ের পটভূমি তৈরি করেছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই জীবনের কোনো পর্যায়ে কোনো টিকাই পায়নি।

হামের টিকার কার্যকারিতার একটি নির্দিষ্ট বিজ্ঞান রয়েছে, যা পুরোপুরি বয়সের ওপর নির্ভরশীল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ছয় থেকে নয় মাস বয়সিদের ক্ষেত্রে এই টিকা মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ করে, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু বর্তমানের এই ভয়াবহ প্রকোপের মুখে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। শিশুদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে টিকার কার্যকারিতা কিছুটা কম হলেও, বাধ্য হয়েই টিকা প্রদানের বয়সসীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতায় বাংলাদেশের টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি নাইট্যাগ এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নিয়মিত নয় মাসের পরিবর্তে এবার প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে ছয় মাস বয়সি শিশুদেরও হামের টিকার আওতায় আনা হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ কার্যক্রমে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শতভাগ সাফল্যের দাবি করেছে, ইউনিসেফের মাঠ পর্যায়ের যাচাইয়ে এখনো শহর ও গ্রামের বহু শিশুর টিকা না পাওয়ার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পথে একটি বড় বাধা।

হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও বেশি করুণ ও হতাশাজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাসপাতালে ভর্তির প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে বহু শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সরাসরি কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই; হাম থেকে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অভিভাবকরা শিশুদের হাসপাতালে আনছেন একেবারে শেষ মুহূর্তে, যখন লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার অভাব এবং হাসপাতালগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

মৃত্যুর এই বিভীষিকা কবে থামবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কণ্ঠে কিছুটা আশার সুর শোনা গেছে। যেহেতু টিকার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব তৈরি হতে অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগে, তাই মে মাসের শেষে শুরু হওয়া টিকাদানের সুফল জুনের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে দৃশ্যমান হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। এরই মধ্যে উচ্চঝুঁকি বিবেচনায় যেসব এলাকায় আগে টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে সংক্রমণের হার কিছুটা কমে আসার প্রমাণ মিলেছে।

তবে এই মহামারী আকারের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কেবল টিকাদানই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। অতীতে কভিড মহামারীর সময় যেমন জরুরি রেসপন্স টিম গঠন করে হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও আইসিইউর তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল, হামের ক্ষেত্রেও তেমন একটি সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জন্য যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয়ভার সহজলভ্য করা না গেলে, শুধু দীর্ঘসূত্রিতা ও সচেতনতার অভাবে আরও অনেক নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

  • Related Posts

    আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী

    ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ বলেছেন, ইসলামের ধারক-বাহক ইমাম ও আলেমদের জন্য রক্ত দিতে হলেও পিছপা হব না। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রিবার্ষিক…

    এনআইডি সংশোধনে সাড়ে ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি, অপেক্ষায় সোয়া লাখ

    ডেস্ক নিউজঃ জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনে জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ‘হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিলাম আমি’, গাড়িতে গুলির পর সংগীতশিল্পী আসিফ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 0 views
    ‘হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিলাম আমি’, গাড়িতে গুলির পর সংগীতশিল্পী আসিফ

    শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে নগদ টাকা, স্বর্ণ ও ১৮ দেশের মুদ্রা

    শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে নগদ টাকা, স্বর্ণ ও ১৮ দেশের মুদ্রা

    আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী

    আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী

    এনআইডি সংশোধনে সাড়ে ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি, অপেক্ষায় সোয়া লাখ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 7 views
    এনআইডি সংশোধনে সাড়ে ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি, অপেক্ষায় সোয়া লাখ

    টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জান্নাতুল কলির এক দশক

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 16 views
    টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জান্নাতুল কলির এক দশক

    ময়মনসিংহ মেডিকেলে অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তদন্তের নির্দেশ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 18 views
    ময়মনসিংহ মেডিকেলে অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তদন্তের নির্দেশ