ইউনূসের শাসনামলে সবচেয়ে বড় কালো আইন ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধন। এ আইন সংশোধন করে আন্ডার কাভার তদন্তের নামে হয়রানি, বিচারের আগেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক করার মতো স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। এ দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে দুদক সংশোধন অধ্যাদেশও ছিল। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই আগের দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ওই অধ্যাদেশ ছিল সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। এতে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করাসহ চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কাউকে বিনা বিচারে সাজা দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, রীতিমতো অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর ধরে এই কাজটি করছে এ অধ্যাদেশ জারি করে। ইউনূসের কালো আইন বাতিল হলেও এ আইনের আওতায় যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের মুক্তি মেলেনি। অবৈধভাবে যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল, যাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং যাদের সম্পত্তি বিচারের আগেই ক্রোক করা হয়েছিল, ইউনূসের কালো আইন বাতিলের ফলে সেসব কর্মকাণ্ড আপনাআপনিই আইনবহির্ভূত হয়ে যায়। তার পরও ভুক্তভোগীরা এখনো প্রতিকার পাননি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউনূসের এ কালো আইনে প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের আগেই প্রায় ১ হাজার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। ইউনূসের এ কালো আইনের কারণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ফলে নতুন করে বেকার হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের কারণে বহু ভালো ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণখেলাপি হয়েছেন। খেলাপি ঋণের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১ তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো হয়নি বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কেবল দুর্বল ব্যাংক নয়, এবার আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
এটি ইউনূসের কালো আইনের ফল। যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে তারা ঋণ পরিশোধ করবেন কীভাবে? আজ বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা করতে বিদেশ যেতেই হবে। কিন্তু বছরের পর বছর যদি উদ্যোক্তা, শিল্পপতিদের বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে তারা ব্যবসা করবেন কীভাবে? বিদেশে যেতে না পারায় অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে আর্থিক খাতে এবং অর্থনীতিতে।
বেসরকারি খাত এ কালো আইনের কারণে বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। ইউনূসের এ কালো আইনে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন এবং অর্থ পাচার এখন সব দেশেরই বড় সমস্যা। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এরকম নিকৃষ্ট কালো আইন নেই। ভারতে ১৯৮৮ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়, যা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়।
অন্যদিকে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে ২০০২ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারতে দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে বলা হয় সিবিআই (কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা)। অন্যদিকে অর্থ পাচার তদন্ত করে ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট)।
ভারতের আইনে তদন্তকারী সংস্থা আদালতের রায়ের আগে কারও সম্পত্তি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে না। শুধু চার্জশিট প্রদানের পর আদালতের অনুমতি-সাপেক্ষে লেনদেন সীমিত করতে পারে। যেন অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যেতে না পারে। ভারতে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট প্রদান করতে হয়। কেবল অভিযোগ আছে এ কারণে বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায় না।
এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। ভারতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। এরকম নিষেধাজ্ঞা জারির সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সময়কাল আদালতে পেশ করতে হয়। পাকিস্তানে এখনো ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইন কার্যকর। যে আইনে একমাত্র আদালতে দোষী প্রমাণিত হলেই কেবল তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা সম্পদ জব্দ করা যায়। পাকিস্তানে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ উল্লেখ করতে হবে।
যুক্তরাজ্যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার (Money Laundering) রোধে অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামো রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ‘ক্লিন মানি’ বা স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে। ব্রিবারি অ্যাক্ট-২০১০ (Bribery Act 2010), যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতিবিরোধী আইন, যা ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এ আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার নেই। শুধু ব্যাংক হিসাব বিবরণীর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। প্রসিডিংস অব ক্রাইম অ্যাক্ট ২০০২ (Proceeds of Crime Act 2002-POCA) : এ আইনের অধীনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ (যেমন- দুর্নীতি, মাদক বা অপরাধের অর্থ) এ আইনে প্রাথমিক তদন্তের পর যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ চিহ্নিত করে সাময়িকভাবে জব্দ করা যায়। কিন্তু এসব দেশে অন্তহীন সময়ের জন্য বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান নেই।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে অন্তহীন মেয়াদে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দুদক বনাম জি বি হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, ‘একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে শুধু এ যুক্তিতে তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া যায় না। কেবল ফৌজদারি মামলায় আছে এ অজুহাতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ (৭৪ ডিএলআর)।
ইউনূস আমলে কেবল সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি আপিল বিভাগের রায় অমান্য করে আদালত অবমাননা করা হয়েছে। বিএনপি সরকার এ কালো আইন বাতিল করেছে। কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে যাদের সীমাহীন দুর্ভোগ হয়েছে তাদের হয়রানি থেকে মুক্তি মেলেনি। অনতিবিলম্বে সরকার এ কালো আইনের আওতায় যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে, বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার আশা করি আর বিলম্ব করবে না।









