ক্রীড়া ডেস্ক : বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন চলছে সময়ের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক লড়াই। ২০২৬ সালের এই মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে ধারণা করা হয়েছিল, এবার বুঝি গতির ঝড়ে সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করবে নতুন প্রজন্মের দুরন্ত ফুটবলাররা। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাতার বা পূর্বের আসরগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে এবার উত্তর আমেরিকা এবং মেক্সিকোর স্টেডিয়ামগুলো সাক্ষী হচ্ছে এক অভাবনীয় দৃশ্যের; যেখানে নতুনদের গতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতার গভীরতা। বয়সের কাঁটা চল্লিশ পেরিয়ে গেলেও যে অদম্য ফুটবলাররা এখনো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের এই জেদ যেন সময়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে।
লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা লুকা মদ্রিচ; এই কিংবদন্তিরা যেন প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, ফুটবল খেলাটা কেবল পেশির লড়াই নয়, বরং এটা মস্তিষ্কের এক গভীরতর শিল্প। ৩৮ বছর বয়সী মেসি যখন কানসাস সিটির মাঠে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শুরু করেন, তখন মনে হয় সময় যেন তার জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও সমান তালে লড়ে যাচ্ছেন। হিউস্টনে কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে তিনি যখন মাঠে নামেন, তখন গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের চোখেমুখে কেবল বিস্ময়। দীর্ঘ দুই দশকের সেই চিরন্তন দ্বৈরথ এখনো জীবন্ত, যা প্রমাণ করে যে জন্মসাল কেবলই সংখ্যা মাত্র।
এই প্রবীণ সেনানীদের তালিকায় সবার উপরে রয়েছেন স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক ক্রেইগ গর্ডন। ৪৩ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে নিজের গোলপোস্টকে এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিলেন। নতুনদের দ্রুতগতির আক্রমণ যখন প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়ায়, ঠিক তখনই গর্ডনের মতো ফুটবলাররা তাদের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। এই বয়সে এসেও যেভাবে তিনি চিতার ক্ষিপ্রতায় বল ঠেকিয়ে যাচ্ছেন, তা বর্তমান ফুটবল বিশ্বের তরুণদের জন্য এক বড় শিক্ষা।
মধ্যমাঠে লুকা মদ্রিচের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ৪০ বছর বয়সে নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে তিনি ক্রোয়েশিয়ার প্রাণভোমরা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠে নামার পর থেকে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত তার দৌড়ঝাঁপ, ক্ষুরধার পাসিং এবং খেলার গতির নিয়ন্ত্রণ দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তার এই লড়াই কেবল নিজের দলের জন্য নয়, বরং এই বয়সে এসেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে কীভাবে ফিটনেস ধরে রাখতে হয়, তার এক জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত।
সেরা গোলদাতা এবং অভিজ্ঞতার অনন্য সমন্বয়ে বসনিয়ার এডিন জেকোর নামটিও উঠে এসেছে সামনের সারিতে। ৪০ বছর বয়সেও তিনি তার দেশের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন। দলের প্রতিটি আক্রমণে তিনি যখন লিড নিচ্ছেন, তখন মনে হয় বসনিয়ার পুরো ভারটাই তার কাঁধে। তার প্রতিটি গোল যেন বয়সের সীমাবদ্ধতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। মাঠের প্রতিটি ঘাসে তার অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট, যা প্রতিপক্ষের তরুণ রক্ষণভাগকে সারাক্ষণ চাপে রাখে।
গোলের নিচে মেক্সিকোর গুইলার্মো ওচোয়ার উপস্থিতি তো ইতিহাস হয়ে গেছে। ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক যদিও এবারের আসরে বেঞ্চে থাকছেন, তবুও তিনি প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে থাকার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। তার এই অর্জন তরুণ গোলরক্ষকদের জন্য এক প্রেরণা। এছাড়া জার্মানির ম্যানুয়েল নয়্যার কিংবা উরুগুয়ের ফার্নান্দো মুসলেরার মতো অভিজ্ঞরা যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন পুরো দল যেন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়, যা কেবল অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
মাঠের দ্রুতগতির লড়াই, প্রচণ্ড গরম এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি; সবকিছুকেই যেন তুচ্ছ করে দিয়েছেন এই ফুটবল নক্ষত্ররা। তরুণদের গতি এবং তেজ অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু যখনই মাঠের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কেবল একটি পাসের দূরত্বে থাকে, তখনই কোচরা বারবার ফিরে তাকান অভিজ্ঞদের দিকে। তারা জানেন, এই প্রবীণদের মাথায় খেলার যে মানচিত্র আঁকা আছে, তা নতুন প্রজন্মের কারো পক্ষেই আয়ত্ত করা এখনো সম্ভব হয়নি।
বিশ্বকাপের এই আসর তাই কোনো সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়; এটি সময় এবং অভিজ্ঞতার এক অগ্নিপরীক্ষা। এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করছেন যে, ফুটবল কেবল দৌড়ঝাঁপের খেলা নয়, বরং এটি মেধা, ধৈর্য এবং সাহসের সমন্বিত এক শিল্পকর্ম। তারা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নিয়ে মাঠে নামেননি, বরং নিজেদের সামর্থ্য এবং নৈপুণ্যের প্রমাণ দিয়েই তারা দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে আছেন। মাঠের সবুজ ঘাসে আজ যখন নতুন প্রজন্মের সাথে তাদের লড়াই জমে ওঠে, তখন ফুটবল বিশ্ব যেন এক নতুন সুর শুনতে পায়; যেখানে বয়স পরাজিত, আর অজেয় কেবল ফুটবল।
সূত্র: মার্কা










