বন বিভাগের প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ: বদলি, নিয়োগ ও বনভূমি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতকে ঘিরে নানা ধরনের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ, পদায়ন, এনওসি প্রদান এবং বনভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে বন বিভাগে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ২৩ বছরের চাকরি জীবনে তিনি রাজধানীর বাইরে বড় ধরনের বদলির মুখোমুখি হননি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ পেয়েছেন।

২০১৩ সালে ঢাকা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় তিনি তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এবং সাবেক উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন বলে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।

অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল সোনারগাঁও চেকপোস্ট। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই চেকপোস্টকে ঘিরে গাছ পরিবহনের ট্রাক থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক কাঠবোঝাই ট্রাক চলাচল করত এবং প্রতিটি ট্রাক থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো। পাশাপাশি চেকপোস্টের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। স্টেশন অফিসার, সহকারী স্টেশন অফিসার এবং বন প্রহরীদের পোস্টিং নিয়েও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন অনেকে।

২০১৬ সালে হোসাইন নিশাত বন অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) পদে দায়িত্ব পান। এই পদে থাকাকালে বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং পেতে অনেককে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হতো।

রেঞ্জ কর্মকর্তা, ফরেস্টার এবং বন প্রহরীদের বদলি নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, লাভজনক রেঞ্জ, চেকপোস্ট বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকতে নিয়মিতভাবে টাকা দিতে হতো। দেশের বিভিন্ন এলাকার পোস্টিংকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বন্যপ্রাণী আমদানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া অনেক ফাইল আটকে রাখা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি এনওসি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো এবং প্রতি মাসে বিপুল সংখ্যক এনওসি থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল।

২০২০ সালে বন বিভাগের পদোন্নতি নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছিল এবং রাজনৈতিক পরিচয় থাকা কিছু ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। এ ঘটনায় বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়।

এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বন বিভাগে কর্মী নিয়োগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের চাচাতো ভাই গিয়াস তালুকদারের মালিকানাধীন ‘বলাকা এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগে কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালে ২৮৪ জন ফরেস্ট গার্ড নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা কমিটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, যেখানে হোসাইন নিশাতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়।

বনভূমি দখল নিয়েও তার দায়িত্বকাল নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের আওতাধীন গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট এলাকায় বিপুল পরিমাণ বনভূমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। এসব এলাকায় রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় বনভূমি দখলের ঘটনায়ও তার সহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি দেশ-বিদেশে সম্পদ গড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে বিদেশেও সম্পত্তি কেনার তথ্য রয়েছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ গড়ার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।

  • Related Posts

    খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাবিরুল আলমসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন…

    মোংলা কাস্টমসে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মকর্তা মামুনের অপসারণ দাবি ব্যবসায়ীদের

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মোংলা কাস্টমস হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অনৈতিক সুবিধা দাবি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে তাঁর অপসারণের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    হামলা না করা শর্তে হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দিতে চায় সৌদি আরব

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৭, ২০২৬
    • 6 views
    হামলা না করা শর্তে হুথিদের ১০০ কোটি ডলার দিতে চায় সৌদি আরব

    মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন বেড়ে ৩২ শতাংশে

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৭, ২০২৬
    • 8 views
    মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন বেড়ে ৩২ শতাংশে

    বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠকে প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

    বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠকে প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

    জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি: প্রধানমন্ত্রী

    জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি: প্রধানমন্ত্রী

    আইনজীবী তালিকাভুক্তির বয়স ৩৫ বছর করার সিদ্ধান্ত

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৭, ২০২৬
    • 11 views
    আইনজীবী তালিকাভুক্তির বয়স ৩৫ বছর করার সিদ্ধান্ত

    উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, গতি হতে পারে ১৪০ কিমি

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৭, ২০২৬
    • 7 views
    উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, গতি হতে পারে ১৪০ কিমি