পিরোজপুর এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ পিরোজপুর জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এবং কোনো ধরনের ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন না করেই বহুল আলোচিত ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিশেষ সহযোগী ও তৎকালীন পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে শত শত কোটি টাকার অবৈধ বিল প্রদান এবং কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হলেও এখনো রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি পিরোজপুরে যোগদানের পর থেকেই একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তার পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশেষ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের কাজ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বিল প্রদান করেন।

দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে মঠবাড়িয়া উপজেলার শিংগা গ্রামের বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন গত ৬ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী বরাবর, ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরাবর এবং ৫ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কাজ না করা সত্ত্বেও নির্বাহী প্রকৌশলী তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় শত কোটি টাকা বিল দিয়েছেন। এছাড়াও ভান্ডারিয়ার ইফতি ইটিসিএল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ না করেই ৮৯ কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে গত বছরের ১৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট বিভাগ কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করে। তিনি ২৮ নভেম্বর বিভিন্ন কৌশলে তার প্রত্যাহারাদেশ স্থগিত করান। আবারও রাষ্ট্রপতির আদেশে সংশ্লিষ্ট বিভাগ গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে পুনরায় বদলির আদেশ দেয়। কিন্তু অজ্ঞাত শক্তির বলে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে এরপর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন মহলে আবারও আবেদন করা হলে তাকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে পুনরায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়ার পর রঞ্জিত দে অফিসিয়ালি কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন।

একটি সূত্র জানায়, পিরোজপুর থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়ার পর পিরোজপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেন। পরে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আবারও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর নিজেকে বিএনপি কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন বিএনপি নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা করেন।

বর্তমানে দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রঞ্জিত দে ঢাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আবারও চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে পিরোজপুরে পুনরায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে যোগদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে। প্রায় শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া এই নির্বাহী প্রকৌশলী এক অদৃশ্য শক্তির বলে বারবার পুনর্বহাল থাকায় সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা শঙ্কিত।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, “এ ইঞ্জিনিয়ার মহা দুর্নীতিবাজ এবং অফিসে অনিয়মিত ছিলেন। তার পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে কাজ ভাগিয়ে দেন। কাজ না করলেও সেসব প্রতিষ্ঠানকে শত কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার অফিসে আমার মোটা অঙ্কের বিল বকেয়া রয়েছে। আমি প্রকাশ্যে কিছু বললে আমার সমস্যা হয়ে যাবে।”

সূত্র জানায়, পিরোজপুরের সাবেক দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে নেছারাবাদ উপজেলার শফিক সুমন নামে এক ঠিকাদারকে বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কোনো ধরনের কাজ না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২২ কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন।

মো. আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি বলেন, “কাজ না করলেও ইঞ্জিনিয়ার ঠিকাদারকে টাকা দিয়েছেন। এ কাজ আদৌ হবে কি না জানি না। আমরা সাধারণ মানুষ ইঞ্জিনিয়ারের এ কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ।”

দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ না করেই বিল প্রদান করায় পিরোজপুরের সাধারণ জনগণ এবং নিয়মিত ঠিকাদাররা পিরোজপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সাবেক দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্ম করার সাহস কেউ না পায়।

এদিকে পিরোজপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    বিশেষ প্রতিবেদক : স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান SK+F- এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কেমিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৈঠকে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না…

    শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

    কক্সবাজারের টেকনাফে ক্রসফায়ারে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ চার আসামিকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় পলাতক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ভারতকে বিদায় করে ১২ বছর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    ভারতকে বিদায় করে ১২ বছর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

    ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ৪ ভারতীয় কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 5 views
    ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ৪ ভারতীয় কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

    ৩ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    ৩ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল

    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 14 views
    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

    রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

    নিত্য-পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি

    নিত্য-পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি