সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়: রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য ও সাংবাদিক হামলার অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চ্যানেল এসের সিইও সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিতর্ক, নিয়োগ বাণিজ্য, সাংবাদিক নির্যাতন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার অবস্থান, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, বিতর্কিত আর্থিক লেনদেন, গোপন রাজনৈতিক সমন্বয় এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

রাজনৈতিক অঙ্গন, সাংবাদিক সমাজ ও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সমপ্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও পর্দার আড়াল থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সুজিত চক্রবর্তী। আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছাড়াই লাইসেন্স?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, চ্যানেল এসের সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গোয়েন্দা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সূত্রটির দাবি, তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ও সরাসরি শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে চ্যানেলটির লাইসেন্স অনুমোদন করানো হয়।

সূত্রটি আরও জানায়, আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার চাপের মুখে ইসমত কাদের গামা চ্যানেলটির অনুমোদন নেন। এমনকি লাইসেন্স প্রদানের আগে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কোনো শক্ত ভিত্তি বা পর্যবেক্ষণও নথিভুক্ত নেই বলে দাবি করেছে ওই সূত্র।

ভারতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ

সম্প্রতি ভারতের অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সুজিত চক্রবর্তীর যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চ্যানেল এসের পরিচয়ে কয়েকজন প্রতিনিধি ভারতে সফর করেছেন।

সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে গোপন সমন্বয় ও যোগাযোগ রক্ষা করা। সুজিত চক্রবর্তীর নির্দেশনায় এসব যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের সাংবাদিক বানানোর অভিযোগ

সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, চ্যানেল এসের কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ক্যাডারদের সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় একাধিক “টিম” গঠন করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি করে টিম নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা পেশাগত যোগ্যতা না থাকলেও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে রাজনৈতিক ক্যাডারদের পুনর্বাসন, অন্যদিকে প্রভাব বিস্তারের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের সমন্বয়?

বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী, সুজিত চক্রবর্তী বর্তমানে সারাদেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন পর্যায়ে চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভারতের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, নিক্সন চৌধুরীসহ একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অর্থনৈতিক সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সক্রিয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করছেন।

এই কর্মকাণ্ডে তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে তুরাগ থানার সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমানে চ্যানেল এসের চিফ রিপোর্টার পরিচয়ধারী রুমনের নাম। এছাড়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের জামায়াতপন্থী আবুল কালাম, খোন্দকার আলমগীর এবং পল্টন এলাকার জামায়াতের এক নেতাকেও তার ঘনিষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে উল্লেখ করছেন অভিযোগকারীরা।

মালিকানা বিক্রি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো চ্যানেল এসের মালিকানা গোপনে বিক্রি। বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ও ১/১১-এর আলোচিত ব্যক্তি ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেমের কাছে চ্যানেলের ২০ শতাংশ মালিকানা ১০ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেম বর্তমানে জননেত্রী পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বরিশাল থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

এছাড়া সিকদার গ্রুপের কাছে ১০ শতাংশ মালিকানা ৮ কোটি টাকায় বিক্রি এবং যুবলীগের আরও এক নেতার কাছে ৫ শতাংশ মালিকানা হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব লেনদেনের অর্থ কোনো ব্যাংকে সংরক্ষণ না করে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করা হয়েছে।

যদিও এসব বিষয়ে সুজিত চক্রবর্তীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টা মামলা

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুজিত চক্রবর্তীর নাম আলোচনায় আসে। অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সকালের সংবাদের সম্পাদক হাফিজুর রহমান শফিক বাদী হয়ে চ্যানেল এসের চেয়ারম্যান ইসমত কাদের গামা, সিইও সুজিত চক্রবর্তীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলাটি দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১০৯ ধারায় দায়ের করা হয়। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে রমনা থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দেশীয় অস্ত্র ও সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। বাদীর অভিযোগ, রহস্যজনক কারণে ওই সময় সুজিত চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করা হয়নি। পরবর্তীতে আদালত “ম্যানেজ” করে খাস কামরায় জামিন নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গায়েব করা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নতুন বিতর্ক

সম্প্রতি চ্যানেল এসের গোপন রাখা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুজিত চক্রবর্তী ও তার ঘনিষ্ঠদের নেতৃত্বে সংঘটিত হামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ফুটেজ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে গত এক বছরে দুইবার তদন্ত কার্যক্রম প্রভাবিত ও ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকজন সাংবাদিক চ্যানেল এস কার্যালয়ে গেলে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে কার্যালয়ে অবস্থান করা ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে এনে হামলা চালানো হয়।

ওই হামলায় হাফিজুর রহমান শফিকসহ অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রচারিত একটি সংবাদে হামলার ভিডিও ফুটেজের আংশিক অংশ প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এতদিন গোপন রাখা ফুটেজের অংশবিশেষ প্রকাশ পাওয়ায় পুরো ঘটনাটি পুনরায় তদন্ত করা এখন জরুরি।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত দৃশ্যমান নয়? রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, মালিকানা হস্তান্তর, সাংবাদিক নির্যাতন ও তথ্য গোপনের মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুজিত চক্রবর্তী বা চ্যানেল এস কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    ব্যান্ডরোল জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত কাস্টমস কর্মকর্তা শামীম উল আলম পেলেন যুগ্ম কমিশনার পদ, উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার নকল সিগারেট স্ট্যাম্প (ব্যান্ডরোল) আমদানির মূল কারিগর হিসেবে অভিযোগ ওঠা কাস্টমসের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোঃ শামীম উল…

    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ইলিয়াস আহম্মেদ। সরকারি দায়িত্বে থেকেই ঘুষ, কমিশন, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি এমনই অভিযোগ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সারা দেশে শুরু ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু

    • By admin admon
    • জুন ২৮, ২০২৬
    • 1 views
    সারা দেশে শুরু ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু

    বাংলাদেশ থেকে যে কারণে কাঁঠাল নিতে চায় চীন

    • By admin admon
    • জুন ২৮, ২০২৬
    • 2 views
    বাংলাদেশ থেকে যে কারণে কাঁঠাল নিতে চায় চীন

    সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়: রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য ও সাংবাদিক হামলার অভিযোগ

    • By admin admon
    • জুন ২৮, ২০২৬
    • 4 views
    সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়: রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য ও সাংবাদিক হামলার অভিযোগ

    ব্যান্ডরোল জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত কাস্টমস কর্মকর্তা শামীম উল আলম পেলেন যুগ্ম কমিশনার পদ, উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন

    • By admin admon
    • জুন ২৮, ২০২৬
    • 20 views
    ব্যান্ডরোল জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত কাস্টমস কর্মকর্তা শামীম উল আলম পেলেন যুগ্ম কমিশনার পদ, উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন

    বুয়েটকে বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে: মাহদী আমিন

    • By Reporter
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 8 views
    বুয়েটকে বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে: মাহদী আমিন

    আফগানিস্তানে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্প, কেঁপেছে কাবুল ও ইসলামাবাদ

    • By Reporter
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 7 views
    আফগানিস্তানে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্প, কেঁপেছে কাবুল ও ইসলামাবাদ