ভুয়া সনদ থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য? বিতর্কের কেন্দ্রে বিআরটিসি কর্মকর্তা জামিল হোসেন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদক: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিবাদী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এ এখনও বহাল রয়েছে বিতর্কিত একাধিক কর্মকর্তা। তাদেরই একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিআরটিসির কর্মকর্তা মো. জামিল হোসেন।

IMG 20260630 WA0006

ভুয়া শিক্ষা সনদে চাকরি গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা সম্প্রতি আবারও লাভজনক চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে পদায়ন হওয়ায় বিআরটিসির অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পুনর্বাসন :
গত ১৭ জুন বিআরটিসির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) দীনেশ সরকার স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জামিল হোসেনকে চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে বদলি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বদলি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়; বরং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি এই লাভজনক ডিপোতে পদায়ন নিশ্চিত করেছেন।

বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য উদ্বেগজনক।

‘লিকুর ভাগ্নে’ পরিচয়ে ক্ষমতার বলয় : অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে গোপালগঞ্জের সন্তান এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক বিশেষ সহকারী ‘লিকু’র ভাগ্নে হিসেবে পরিচয় দিতেন জামিল হোসেন। এই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন বিআরটিসিতে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবে বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

ভুয়া ভাউচার, চাঁদাবাজি ও ওয়াইফাই কেলেঙ্কারি :
বিভিন্ন ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে জামিল হোসেনের বিরুদ্ধে গাড়ি মেরামতের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মেরামতের কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস থেকে ট্রিপপ্রতি এক হাজার টাকা করে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, এসি বাসে যাত্রীদের জন্য ওয়াইফাই সুবিধা চালুর নামে বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ বাসে এ সুবিধা কখনও চালু করা হয়নি।

নিম্নমানের কাজে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ : বরিশাল বিআরটিসি বাস ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ নিম্নমানেরভাবে সম্পন্ন করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে জামিল হোসেনের বিরুদ্ধে। ডিপোর একাধিক সূত্রের দাবি, এসব কাজে ব্যাপক অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ ও বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তাকে বরিশাল থেকে গোপালগঞ্জের বাগডিভূতে বদলি করা হয়। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও লাভজনক চট্টগ্রাম ডিপোতে তার পদায়ন নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অবৈধ সম্পদের পাহাড় ?
বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, চাকরি জীবনে সীমিত বেতন-ভাতার বাইরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন জামিল হোসেন। নিজ এলাকায় তিনি একটি আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষোভ : বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পরও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশলে প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বজায় রেখেছেন। তাদের মতে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে এখনও প্রশাসনের একটি অংশকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়ার কথা, তারাই এখন ভালো পোস্টিং পাচ্ছেন। এতে সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।”

বক্তব্য পাওয়া যায়নি :
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে জামিল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি উঠেছে, জামিল হোসেনের চাকরির সনদ, সম্পদের উৎস, বদলি প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব পালনকালীন আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হোক। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • Related Posts

    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    বিশেষ প্রতিবেদক : স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান SK+F- এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কেমিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৈঠকে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না…

    শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

    কক্সবাজারের টেকনাফে ক্রসফায়ারে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ চার আসামিকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় পলাতক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ভারতকে বিদায় করে ১২ বছর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    ভারতকে বিদায় করে ১২ বছর পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

    ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ৪ ভারতীয় কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 5 views
    ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ৪ ভারতীয় কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

    ৩ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    ৩ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল

    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 15 views
    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

    রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

    নিত্য-পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি

    নিত্য-পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি