দেশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি

image_pdfSaveimage_print
ডেস্ক নিউজঃ দেশে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ কৃষি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখনো নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে অনেক কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলের মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও নিম্ন অথবা নিম্ন থেকে মাঝারি পর্যায়ে অবস্থান করছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা, পুষ্টি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উত্পাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে মাটির জৈব পদার্থ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির বিষয়টি এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘ইয়ারবুক অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০২৫’ বা বিবিএসের প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জি ২০২৫-এ দেশের মোট ভূমিকে ২০টি প্রধান ভৌগোলিক একক এবং ৩০টি কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলের মাটির গঠন, অম্লতার মাত্রা, জৈব পদার্থের অবস্থা, ভূমির ধরন এবং সাধারণ উর্বরতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিবিএসের মতে, অঞ্চলভেদে মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যের এই পার্থক্য কৃষি উত্পাদন, ফসল নির্বাচন, সারের ব্যবহার এবং কৃষি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেভেল বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২৫), হাই বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২৬), উত্তর-পূর্ব বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২৭), মধুপুর ট্র্যাক্ট (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২৮), উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২৯), পুরোনো হিমালয় পাদদেশ সমভূমি (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-১), সক্রিয় তিস্তা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২), তিস্তা মিয়ান্ডার বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-৩) এবং সক্রিয় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-৭) সহ একাধিক অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের অবস্থা নিম্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের অনেক ক্ষেত্রেই মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষেত্রে বিবিএস বলছে, মাটির পানি ধারণক্ষমতা কম, জৈব পদার্থের পরিমাণ কম এবং উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদান সীমিত। মধুপুর ট্র্যাক্টের মাটিও তুলনামূলকভাবে অম্লীয়, জৈব পদার্থ কম এবং পানি ধারণক্ষমতা কম। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাগুলোর মাটিতেও জৈব পদার্থের পরিমাণ ও উর্বরতার অবস্থা তুলনামূলকভাবে নিম্ন।

তবে দেশের সব অঞ্চলের চিত্র একই নয়। লোয়ার আত্রাই বেসিন (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-৫), গঙ্গা জোয়ার-ভাটা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-১৩), গোপালগঞ্জ-খুলনা বিল (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-১৪) এবং সিলেট অববাহিকা (কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল-২১)-এর মতো অঞ্চলে জৈব পদার্থের অবস্থা মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এসব অঞ্চলের অনেক স্থানে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও মাঝারি বা উচ্চ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিবিএস।

বাংলাদেশে মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়। মৃত্তিকা বিষয়ক তথ্যভান্ডার বাংলাপিডিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অধিকাংশ মাটিতেই জৈব পদার্থের পরিমাণ কম এবং উচ্চ ও মাঝারি উচ্চভূমির প্রায় ৭০ শতাংশ আবাদি জমিতে মাটির জৈব পদার্থ ২ শতাংশেরও কম। এতে অনেক কৃষিজমির উত্পাদনশীলতা সীমিত হয়ে পড়ে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, মাটির জৈব পদার্থ শুধু উদ্ভিদের পুষ্টির উত্স নয়; এটি মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, মাটিতে পুষ্টি ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং মাটির অণুজীবের কার্যক্রম সচল রাখে। কৃষিজমি থেকে জৈব পদার্থের ঘাটতি হলে মাটির উর্বরতা ও টেকসই উত্পাদন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে, একই জমিতে বছরের পর বছর নিবিড় চাষাবাদ, জৈব সার ও কম্পোস্টের সীমিত ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সুষম মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার অভাবে মাটির জৈব পদার্থ কমে যেতে পারে। এ কারণে অনেক দেশে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সংরক্ষণমূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। এফএও টেকসই কৃষির জন্য এ ধরনের ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে।

বিবিএসের কৃষি বর্ষপঞ্জিতে দেশের মাটির উর্বরতা অতীতের তুলনায় বেড়েছে বা কমেছে- এমন কোনো সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবেদনে দেশের বর্তমান মৃত্তিকা বৈশিষ্ট্যের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে জৈব পদার্থের অবস্থা এখনো নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে জৈব পদার্থ ও উর্বরতার অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে কৃষি খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার। অর্থনীতিতে কৃষির এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রেক্ষাপটে অঞ্চলভিত্তিক মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য, জৈব পদার্থের অবস্থা এবং মাটির উর্বরতা সম্পর্কিত তথ্য কৃষি পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অঞ্চলভিত্তিক মাটি ব্যবস্থাপনা, সুষম সার ব্যবহার, জৈব সার ও কম্পোস্টের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো উদ্যোগ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  • Related Posts

    পানির পাইপলাইনে বিষ প্রয়োগ ‘সাবভার্সিভ অ্যাক্টিভিটিজ’: এসপি মাসুদ

    ডেস্ক নিউজঃ রাস্তা কেটে দেওয়া বা ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ ‘অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম’ বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। তিনি বলেছেন, দেশের ও সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান…

    শিগগিরই বাস্তবায়িত হচ্ছে নবম পে-স্কেল, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রস্তুতি

    ডেস্ক নিউজঃ অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্ক অবস্থানের কারণে বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    পানির পাইপলাইনে বিষ প্রয়োগ ‘সাবভার্সিভ অ্যাক্টিভিটিজ’: এসপি মাসুদ

    • By admin admon
    • জুলাই ২৭, ২০২৬
    • 6 views
    পানির পাইপলাইনে বিষ প্রয়োগ ‘সাবভার্সিভ অ্যাক্টিভিটিজ’: এসপি মাসুদ

    দুপুরের মধ্যে দেশের ৮ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কতা

    • By admin admon
    • জুলাই ২৭, ২০২৬
    • 6 views
    দুপুরের মধ্যে দেশের ৮ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কতা

    শিগগিরই বাস্তবায়িত হচ্ছে নবম পে-স্কেল, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রস্তুতি

    • By admin admon
    • জুলাই ২৭, ২০২৬
    • 5 views
    শিগগিরই বাস্তবায়িত হচ্ছে নবম পে-স্কেল, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রস্তুতি

    আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন নীতিমালা, এরপরই পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা: ববি হাজ্জাজ

    • By Reporter
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 11 views
    আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন নীতিমালা, এরপরই পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা: ববি হাজ্জাজ

    মেধাবী ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী

    • By Reporter
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 10 views
    মেধাবী ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী

    ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়ছে সাহারা, মারা যাচ্ছে উট

    • By Reporter
    • জুলাই ২৬, ২০২৬
    • 10 views
    ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়ছে সাহারা, মারা যাচ্ছে উট