অস্তিত্বহীন অফিসে গণপূর্তের ৩১১ কর্মকর্তার পদায়ন, ১০ মাসেও নেই বেতন-ভাতা

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নবসৃষ্ট পদগুলোতে সবার আগে পোস্টিং হয়েছিল ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহর। তাকে বদলি করা হয় শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ। গত বছরের আগস্টে বদলি করা হলেও এখন পর্যন্ত তিনি অফিস খুঁজে পাননি। শেরেবাংলানগর-৪-এর আওতাধীন এলাকাও বুঝে পাননি। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, স্টাফ অফিসারসহ সাপোর্টিং স্টাফও নেই তার। ১০ মাস ধরে পাচ্ছেন না বেতন-ভাতাও। অফিস কোড না হওয়ায় তার আওতাধীন এলাকার টেন্ডারসহ সকল উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে শেরেবাংলানগর-১ বিভাগ থেকে। 

জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলানগর এলাকার বড় অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন মো. আনোয়ার হোসেন। সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয় তার নাম। তাকে ইএম ডিভিশন-১২ তে বদলি করা হয়েছে গত মার্চ মাসে। কিন্তু সেই ডিভিশন-১২-এর অফিস কিংবা এর আওতাধীন এলাকার কোনোটিই তিনি এখনও খুঁজে পাননি। এমন অস্তিত্বহীন পোস্টিংয়ের কারণে মাঝেমধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে হাজিরা দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজও নেই তার। তিনিও কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। নেই কোনো স্টাফ এবং গাড়ি সুবিধা।

নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে রয়েছে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ, নতুন ঢাকা ডিভিশন-৫ ও জরিপ বিভাগ। এই বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা ডিভিশন-৫-এর কোনো অস্তিত্বই নেই। গণপূর্ত অধিদপ্তরে এমন ঘটনা একটি-দুটি নয়, বরং অনেক। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিং আছে, কিন্তু অফিস নেই। নেই বেতন-ভাতাও। একইভাবে নেই পরিদর্শক গাড়ি। এমন পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার কারণ সেখানে নতুন এক সেটআপ তৈরির সিদ্ধান্ত।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অনেক স্থাপনা নির্মিত হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান জনবলে তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছিল না। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে নতুন সেটআপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা কাটাছেঁড়ার পর গত বছরের ৭ আগস্ট ৩১১টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সম্মতি জ্ঞাপন করে। কাজ বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি জেলা সদরে ইলেকট্রো মেকানিক্যালের ডিভিশনও অনুমোদন পায়। কিন্তু জনবল অনুমোদন দিয়েই যেন দায়িত্ব শেষ করেছে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

ফলে অনুমোদিত পদগুলোতে পদোন্নতি ও পোস্টিং দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত নবসৃষ্ট পদে যোগদানকারী কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। ওয়ার্কিং ডিভিশনগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অফিস কোড অনুমোদন করা হয়নি। পাশাপাশি আইবাস কোড তৈরি না হওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ নির্মাণ-রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কাজ করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যাপক চেষ্টা-তদ্বির করা হলেও এখনও কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তবে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজন সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, নবসৃষ্ট পদগুলোর মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ১০৭টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) ১টি, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ২টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ১৪টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) ১১টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ১৭টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ইএম) ৩টি, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ৪০টি, সহকারী প্রকৌশলী (ইএম) ১৮টি। অবশিষ্ট পদগুলো নন-ক্যাডার থেকে শুরু করে অফিস সহায়ক পর্যন্ত। গত বছরের ৭ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর নবসৃষ্ট পদে পোস্টিং ও পদোন্নতি দেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু আইবাস কোড ও অফিস কোড সৃষ্টি না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে যায়।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শেখ নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক পত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নবসৃষ্ট পদের বিপরীতে ১৯টি অফিসের আইবাস কোড সৃজনের অনুরোধ জানিয়ে পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মাসেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নতুন অফিস কোড না থাকায় এসব পদের বিপরীতে যোগদানকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। আইবাস কোড না থাকায় টেন্ডারসহ উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজও করা যাচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর নবসৃষ্ট পদে বদলি ও পদোন্নতি দিতে যতটা আগ্রহী ছিল ঠিক ততটাই অনাগ্রহী এসব অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা চিহ্নিত করে তা সংশ্লিষ্ট অফিসকে বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে। নবসৃষ্ট পদগুলোর কর্মকর্তারা জানেনই না, তার দায়িত্বের অধীন কোনো কোনো এলাকা। বিসিএস গণপূর্তের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ ২০২৫ সালে অনুমোদিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন সেট-আপে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হয়েছেন। নবসৃষ্ট এ পদে তার নেই কোনো অফিস, নেই কোনো ব্যবস্থাপনা, এমনকি নেই কোনো বেতন-ভাতাও। গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন না পাওয়ায় তিনি মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাবেন তিনি। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন পরিস্থিতিতে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

ময়মনসিংহে কর্মরত গণপূর্তের ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামালকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে। ঢাকায় পোস্টিং পেয়ে বেশ আনন্দিতই হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোনো অফিস এবং সাপোর্টিং স্টাফ পাননি। অগত্যা সার্কেলের অধীনে থাকা মহাখালী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসে বসছেন তিনি। কিন্তু অফিস কোড সৃষ্টি না হওয়ায় অধস্তন কর্মকর্তার অফিস ‘দখল করে’ বসতে পারলেও কোনো কাজ করতে পারছেন না। ওদিকে তিনি বসার কারণে অফিসে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে মহাখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলাম। মোস্তফা কামালও বেতন-ভাতা পান পাচ্ছেন না আট মাস ধরে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এমন পোস্টিং আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। আমাদের অফিসের কথা বলা হলেও কার্যত কোনো অফিস নেই, চলাচলের জন্য কোনো যানবাহন নেই, কাজ নেই এমনকি জীবনধারণের জন্য বেতনটা পর্যন্ত নেই। এই পোস্টিং আমাদের পারিবারিকভাবেও ছোট করেছে। আসলেই আমাদের চাকরি আছে কি না? যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমাদের কাছে। অপর এক প্রকৌশলী জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের আগে উচিত ছিল অফিস কোড সৃজন করা এবং পরবর্তীতে পোস্টিং ও পদোন্নতি দেওয়া। নতুন অফিস সৃষ্টি, কর্মবণ্টন, লজিস্টিক সাপোর্ট, জনবল, চেয়ার-টেবিল, পরিদর্শন গাড়ি সরবরাহ করে পদায়ন করলে আজকের এই উদ্ভট সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।

  • Related Posts

    বিআইডব্লিউটিএতে ‘রহিম সিন্ডিকেটের’ দাপট ভুয়া বিল, জ্বালানি তেল লোপাট ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ; ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শতকোটি টাকার সম্পদের দাবিও

    নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্ষমতার প্রভাব, কথিত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট—এসবের সমন্বয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম…

    ৩ লাখ ৮৫ হাজার থেকে ৩২ লাখ: জোয়ার সাহারা ডিপোর বাস মেরামতে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোর একটি বাসকে কেন্দ্র করে মেরামত ব্যয়, যন্ত্রাংশের হিসাব, ইনভেন্টরি এবং বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ১৮ আগস্ট চালু হচ্ছে বিআরটিসির ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 7 views
    ১৮ আগস্ট চালু হচ্ছে বিআরটিসির ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস

    বিশ্বজুড়ে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, জাতিসংঘের সতর্কতা

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 6 views
    বিশ্বজুড়ে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, জাতিসংঘের সতর্কতা

    ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু, মিশরে হাসপাতালে ভর্তি ১৮

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 6 views
    ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু, মিশরে হাসপাতালে ভর্তি ১৮

    সোনারগাঁয়ে ৩ চুনা কারখানা গুঁড়িয়ে দিল তিতাস, বিচ্ছিন্ন অবৈধ গ্যাস সংযোগ

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 4 views
    সোনারগাঁয়ে ৩ চুনা কারখানা গুঁড়িয়ে দিল তিতাস, বিচ্ছিন্ন অবৈধ গ্যাস সংযোগ

    বাংলাদেশের এই জয় বিশ্বের কাছে একটি বার্তা: তামিম ইকবাল

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 4 views
    বাংলাদেশের এই জয় বিশ্বের কাছে একটি বার্তা: তামিম ইকবাল

    শেষ ম্যাচে ২৩৭ রানে উড়িয়ে মালয়েশিয়াকে ধবলধোলাই করল বাংলাদেশ

    • By Sara
    • আগস্ট ১৬, ২০২৬
    • 5 views
    শেষ ম্যাচে ২৩৭ রানে উড়িয়ে মালয়েশিয়াকে ধবলধোলাই করল বাংলাদেশ