বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কিশোরগঞ্জ জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, কাজ শেষ হওয়ার আগেই অগ্রিম বিল প্রদান, নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিল অনুমোদন দেন এবং এতে সরকারের শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, Haor Infrastructure and Livelihood Improvement Project (HILIP)-এর আওতায় কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ভুয়া LCS (Labour Contracting Society) কমিটির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের বড় একটি অংশ উত্তোলন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ছিল না। একই সঙ্গে ওইসব এলাকায় নির্মিত অনেক সাবমার্জিবল (ডুবন্ত) সড়ক নিম্নমানের হওয়ায় এক বছরের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সড়কের অস্তিত্ব পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
শুধু HILIP নয়, ময়মনসিংহ অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প, আমফান পুনর্বাসন প্রকল্প, আইআরআইডিপি (IRIDP) এবং জিওবি মেইনটেন্যান্স প্রকল্পসহ আরও কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পেও কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বড় অঙ্কের অগ্রিম বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিলের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অবৈধ সুবিধা নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে সরকারি অর্থ ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘনের একটি অংশ।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর উত্তরপাড়া থেকে ঘোষের কান্দি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য সরকার কনস্ট্রাকশনকে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়। একইভাবে মিঠামইন উপজেলার কাঠখাল বাজার থেকে বৈরাটি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজে মোজাহার এন্টারপ্রাইজকে প্রায় তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ দুটি ঘটনা কেবল উদাহরণ; তাঁর দায়িত্বকালে আরও অনেক প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের প্রভাব ব্যবহার করে আমিরুল ইসলাম প্রশাসনের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। এ কারণে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেক নির্দেশও তিনি গুরুত্ব দিতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেসব তদন্ত শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ফল দেয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, সে সময়ের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে তদন্তগুলো আর এগোয়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন The Southern Chattogram Regional Development Project (SCRDP)-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে মো. আমিরুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যার বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অগ্রিম বিল প্রদানের মতো অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদেশি অর্থায়নের বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা এবং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সচেতন মহল কিশোরগঞ্জে তাঁর দায়িত্বকালীন সব প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, কাজের মান এবং অগ্রিম বিল প্রদানের বিষয়গুলো নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ে জমা থাকা অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আমিরুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাজ ছাড়াই অগ্রিম বিল দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে নিয়ম অনুযায়ী বিল প্রস্তুত হয়ে বিভিন্ন দপ্তর অতিক্রম করে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আসে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিল পরিশোধ করা হয়। তিনি দাবি করেন, তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক পদে তাঁর নাম প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অংশ হিসেবে তিনি একাধিক ভাইভায় অংশ নিয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও একটি প্রকল্পের জন্য ভাইভা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।








