কেন ইরানের ‘রহস্যময়’ পিকঅ্যাক্স পর্বত গুঁড়িয়ে দিতে চান ট্রাম্প?

image_pdfSaveimage_print

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের রহস্যময় পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্থাপনাটি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এটিকে ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কোথায় অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন?
‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত একটি পাহাড়ি এলাকা, যেখানে পাহাড়ের গভীরে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্স। স্থাপনাটি শত শত মিটার পুরু কঠিন গ্রানাইট শিলার নিচে অবস্থিত হওয়ায় প্রচলিত বাঙ্কার-ভেদী শক্তিশালী বোমা দিয়েও এটি পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাহাড়ের গভীরে এই স্থাপনা নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়া।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সন্দেহ- ইরান এখানে একটি গোপন, ঘোষণাবহির্ভূত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

তবে তেহরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ইরানের দাবি, ২০২০ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের উদ্দেশ্য কেবল উন্নতমানের সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য একটি নিরাপদ শিল্প স্থাপনা তৈরি করা; সেখানে কোনও গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে না।

ট্রাম্পের হুমকি
মার্কিন রেডিও উপস্থাপক হিউ হিউইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ধ্বংস করব। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন।”

তিনি আরও দাবি করেন, “আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ওপর খুব নিবিড় নজর রাখছি। সেখানে এখন কোনও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম দেখছি না। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। যখনই আমরা কিছু শুনি, তখনই সেটি ধ্বংস করে দিই। তাই তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চায় না। খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্সেও হামলা হতে পারে।”

তবে ট্রাম্প তার দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
ট্রাম্পের এই হুমকির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক অভিযান চালায়।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা তৃতীয় রাতের মতো পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।

সেন্টকমের দাবি, পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে ‘নির্ভুল নির্দেশিত’ অস্ত্র ব্যবহার করে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং নৌ-সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অস্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

কোথায় কোথায় বিস্ফোরণের খবর?
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- কিশ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ, আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও জাম এলাকা।

বার্তা সংস্থা ফার্স স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এসব এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে।

মেহর নিউজ এজেন্সিও কিশ ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, বন্দর আব্বাসে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কিশ দ্বীপে দুটি বিস্ফোরণের কথা জানালেও ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য দেয়নি।

মেহরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশের ওমিদিয়েহ শহরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন।

এছাড়া নূর নিউজ জানিয়েছে, সোমবার রাতের হামলার পর কিশ দ্বীপের বন্দরে তিনটি নৌযানে আগুন ধরে যায়।

কূটনীতির পথ কি এখনও খোলা?
সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা ‘অবশ্যই সম্ভব’। তবে একই সময়ে ওয়াশিংটন একদিকে নতুন সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধও পুনর্বহাল করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সামরিক চাপ বাড়ানো এবং অন্যদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতায় বাধ্য করার’ কৌশল অনুসরণ করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন তারা। 

  • Related Posts

    নেপালের বন্যায় সেই বাড়ির বারান্দায় আটকা পড়া ব্যক্তিরা উদ্ধার

    আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালে ভয়াবহ বন্যার মধ্যে চারপাশ থেকে তীব্র কাদাপানির স্রোত ধেয়ে আসার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবল স্রোতের মধ্যে একটি হালকা সবুজ…

    চার মাসে তেল বিক্রি করে ৭৫০ কোটি ডলার আয় করেছে ইরান

    আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আমেরিকার নৌবাহিনীর অবরোধের মধ্যেই গত চার মাসে তেল বিক্রি করে ৭৫০ কোটি ডলার আয় হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। শনিবার বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    নেপালের বন্যায় সেই বাড়ির বারান্দায় আটকা পড়া ব্যক্তিরা উদ্ধার

    • By Sara
    • আগস্ট ২৯, ২০২৬
    • 6 views
    নেপালের বন্যায় সেই বাড়ির বারান্দায় আটকা পড়া ব্যক্তিরা উদ্ধার

    চার মাসে তেল বিক্রি করে ৭৫০ কোটি ডলার আয় করেছে ইরান

    • By Sara
    • আগস্ট ২৯, ২০২৬
    • 4 views
    চার মাসে তেল বিক্রি করে ৭৫০ কোটি ডলার আয় করেছে ইরান

    নাফ নদে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ আটক ৩

    • By Sara
    • আগস্ট ২৯, ২০২৬
    • 5 views
    নাফ নদে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ আটক ৩

    জাতীয় দলে ফিরতে প্রবাসী ফুটবলারদের সামনে নতুন পরীক্ষা

    • By Sara
    • আগস্ট ২৯, ২০২৬
    • 5 views
    জাতীয় দলে ফিরতে প্রবাসী ফুটবলারদের সামনে নতুন পরীক্ষা

    টপ এন্ড টি-টোয়েন্টির সেমিফাইনালে বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষ ভিক্টোরিয়া

    • By Sara
    • আগস্ট ২৯, ২০২৬
    • 7 views
    টপ এন্ড টি-টোয়েন্টির সেমিফাইনালে বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষ ভিক্টোরিয়া

    “গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীকে ঘিরে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি”

    “গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীকে ঘিরে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি”