বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক বদলি আদেশকে ঘিরে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব এবং অর্থের বিনিময়ে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়ার অভিযোগে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া চালান এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) মো. মুশফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সম্প্রতি ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। এই আদেশ প্রকাশের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, যেসব কর্মকর্তা মাত্র ছয় মাস আগে ঢাকার বাইরে থেকে বদলি হয়ে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের প্রশাসনিক প্রয়োজন বা গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছাড়াই আবার বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সরকারি বদলি নীতিমালার সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, জাতীয় গৃহায়ণের প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই ড্রাফটসম্যানের সংকট রয়েছে। প্রয়োজন মেটাতে বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক লোক এনে কাজ করাতে হচ্ছে। অথচ প্রকৌশল বিভাগে দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে ড্রাফটম্যান পদকে ভূমি শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মতে, এটি কোনো প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে হিসাব সহকারী মো. মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদকে ঘিরে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চালান জাল করে প্রায় ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সরকারি চালান জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেন। পরে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে চাকরিতে বহাল থাকার সুযোগ পান। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এমন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তাকে কেন আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো।
শুধু ফুয়াদই নন, তার খালাতো ভাই ফারুকের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফারুক ও ফুয়াদ একই সিন্ডিকেটের সদস্য। এই সিন্ডিকেট উপ-পরিচালকের সঙ্গে যোগসাজশ করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পছন্দের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বদলি নিশ্চিত করেছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বদলি আদেশে ড্রাফটম্যান মো. হানিফ মিয়াকে স্থাপত্য শাখা থেকে উপ-পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি কর্মকর্তা) দপ্তর-২-এ, হিসাব সহকারী মো. মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদ, মো. আশরাফুল ইসলাম এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরকে উপ-পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি কর্মকর্তা) দপ্তর-১-এ এবং মো. মাজেদুল ইসলামকে নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়, ঢাকা-২-এ বদলি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব পদায়ন এমন সব শাখায় করা হয়েছে, যেগুলোকে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) মো. মুশফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই। পরে বিষয়টি নিয়ে জানতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনদ্বীপ গড়াইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরে জানানো হবে।











