হাজারো আবেদন, ঘুষের অভিযোগে লাইসেন্স বিতর্ক; সাকিলা ইসলামকে ঘিরে সিন্ডিকেটের দাবি

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারি লাইসেন্স সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (ওএন্ডএম) সাকিলা ইসলাম। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্স দেওয়া, পুরোনো লাইসেন্স নবায়ন এবং আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই কার্যক্রমে সাকিলা ইসলামের সঙ্গে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক শিপন মিয়া, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. আল-আমিন, উচ্চমান সহকারী মো. অহিদুল ইসলাম এবং সুপার হিসেবে পরিচিত মো. আমিনুল ইসলামের নাম রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা গণপূর্ত জোনের সাবেক অফিস সহায়ক মো. হান্নানের নামও এসেছে। তিনি অবসরে যাওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আর্থিক লেনদেনে মধ্যস্থতাকারী বা ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, লাইসেন্সের ধরন ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী আবেদনকারীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি অর্থ চাওয়া হয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে এবং বাকি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

লাইসেন্স শাখার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নতুন ঠিকাদারি লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আবেদন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন সদস্যের কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করার কথা। এরপর সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অনুমোদনের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে এই নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে ১৫৬১ ও ১৫৬২ নম্বর স্মারকের আওতায় দেওয়া কিছু ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঈদের ছুটির ঠিক আগের দিন কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এসব লাইসেন্স দেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের সুপারিশ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কিছু লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে আগে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন।

২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তিতেও আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ের নির্দিষ্ট নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে আবেদন জমা দেওয়ার কথা। পরে আবেদনপত্রের তথ্য ও নথি যাচাই করে কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ পাঠানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে কিছু আবেদন নির্ধারিত সময়ের পরও গ্রহণ করা হয়েছে এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সব জায়গায় একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

অনুসন্ধানে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মানি রিসিটে পরিবর্তন বা টেম্পারিং, নির্ধারিত সময়ের পরে আবেদন গ্রহণ, প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর ছাড়া কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণ এবং মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সুপারিশ ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ। এমনকি অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ের সিল অবৈধভাবে তৈরি করে কাগজপত্রে ব্যবহার এবং স্বাক্ষর জাল করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

লাইসেন্স শাখায় কাজ করা কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলার পরও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাদের দাবি, নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ না দিলে অনেক আবেদনকারীর কাজ দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। নতুন লাইসেন্সের পাশাপাশি পুরোনো লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কর্মচারীর দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন শাখায় প্রায় তিন হাজার নতুন লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এত বিপুলসংখ্যক আবেদনকে কেন্দ্র করে একটি চক্র অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী দরকষাকষি করে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আবেদনকারীদের যোগ্যতা ও কাগজপত্রের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

লাইসেন্স শাখায় পোস্টিং নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই শাখায় দায়িত্ব পেতে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ দিতে হয়েছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, শাখাটিতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজধানী ঢাকা ও নিজ এলাকায় আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে। তবে কারও সম্পদের বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

মো. হান্নানের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে আলাদা অভিযোগ। তিনি অবসর নেওয়ার পরও লাইসেন্স শাখার বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করেন বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাকিলা ইসলাম চাকরিতে যোগদানের সময় থেকেই হান্নান তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিভিন্ন কাজ করে আসছেন। তবে হান্নানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিলা ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েকজন ফোন ধরলেও বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। অন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ঠিকাদারি লাইসেন্স প্রদান একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সেখানে আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই, কমিটির সুপারিশ এবং অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে অনুসরণ করা জরুরি। তাই লাইসেন্স শাখাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের দায়ও নির্ধারণ করা দরকার।

  • Related Posts

    ঢাকা বন বিভাগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ, ডিএফও বশিরুলকে ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদক: ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণ, অবৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট তৈরি এবং এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে,…

    রেলের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ, আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীনকে ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচন, কেনাকাটা এবং সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে নগদ টাকা, স্বর্ণ ও ১৮ দেশের মুদ্রা

    শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে নগদ টাকা, স্বর্ণ ও ১৮ দেশের মুদ্রা

    আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী

    আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী

    এনআইডি সংশোধনে সাড়ে ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি, অপেক্ষায় সোয়া লাখ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 5 views
    এনআইডি সংশোধনে সাড়ে ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি, অপেক্ষায় সোয়া লাখ

    টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জান্নাতুল কলির এক দশক

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 14 views
    টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জান্নাতুল কলির এক দশক

    ময়মনসিংহ মেডিকেলে অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তদন্তের নির্দেশ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 17 views
    ময়মনসিংহ মেডিকেলে অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তদন্তের নির্দেশ

    ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলল আফগানিস্তান

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৪, ২০২৬
    • 17 views
    ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলল আফগানিস্তান