গুলশানের ১১৪ কাঠা জমি নিয়ে ওয়াসার উদ্যোগ, সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঢাকা ওয়াসার ১১৪ কাঠা জমি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের পর ওই জমিতে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির আশঙ্কা, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে এগোলে সরকারি সম্পত্তি শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধায় ব্যবহৃত হতে পারে।

টিআইবির মতে, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি জমি নিয়ে প্রস্তাব দিলে সেটি যাচাই-বাছাই করে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগ হচ্ছে, প্রস্তাবটি সরাসরি বাতিল না করে সেটি বিবেচনার জন্য কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা ওয়াসা। এখানেই মূল প্রশ্ন—কেন একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে এত দ্রুত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলো?

গুলশানের ১১৪ কাঠা জমি সাধারণ কোনো সম্পত্তি নয়। রাজধানীর অত্যন্ত মূল্যবান এই এলাকায় সরকারি মালিকানাধীন জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ, স্বচ্ছতা এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে জমি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সেখানে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

বিষয়টি নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসার সম্পদ মূলত জনগণের সম্পদ। তাই এসব সম্পত্তি ব্যবহার করে কোনো প্রকল্প বা নির্মাণকাজ করতে হলে নিয়ম মেনে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক প্রস্তাবের ওপর নির্ভর করে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত ও প্রভাব খাটানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজউকের ভূমিকা ঘিরে। টিআইবির বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটি রাজউক থেকে ইজারা নেওয়া হলেও জমির উন্নয়নসংক্রান্ত বর্তমান উদ্যোগ সম্পর্কে রাজউক অবগত নয়। যদি বিষয়টি সত্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কীভাবে সরকারি জমি নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এখানেই থেমে নেই বিতর্ক। ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির একটি অংশও প্রস্তাবটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। অর্থাৎ ওয়াসার অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন বা ভিন্নমত রয়েছে। এমন অবস্থায় ১১৪ কাঠার মতো মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি নিয়ে প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কারণ কী—তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

সমালোচনার আরেকটি জায়গা হলো, সরকারি জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না। টিআইবির বক্তব্য, ঢাকা ওয়াসার সত্যিই যদি ওই জমিতে ভবন নির্মাণ বা উন্নয়ন করার প্রয়োজন থাকে, তাহলে আগে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

এদিকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো ধরনের চাপের কারণে নয়, বরং ওয়াসার স্বার্থ বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে টিআইবির বক্তব্য হলো, প্রক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা অবস্থাতেই যদি কোনো অনিয়ম বা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা দরকার।

ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নয়, বরং জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপমুক্ত পরিবেশে ঢাকা ওয়াসাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে গুলশানের ১১৪ কাঠা জমি নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—এটি কি সত্যিই ঢাকা ওয়াসার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি উন্নয়ন উদ্যোগ, নাকি কোনো নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়া? অভিযোগগুলো সত্য কি না, সেটি তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হতে পারে। তবে সরকারি সম্পত্তি নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে জমির মালিকানা, ইজারা, প্রস্তাবের বৈধতা, কমিটি গঠন, অভ্যন্তরীণ আপত্তি এবং সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা—সবকিছুই স্বচ্ছভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

টিআইবি তাই উদ্যোগটি পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি পুরো বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। কারণ সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার নিয়ে সামান্য অস্পষ্টতাও যদি থাকে, সেটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের অনিয়ম বা ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। গুলশানের ১১৪ কাঠা জমি শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, নাকি কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা তৈরি করবে—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

  • Related Posts

    দিলীপ আগরওয়ালাকে ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ

    বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিতে আহত এক শিক্ষার্থীর করা হত্যাচেষ্টা মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। এর আগে এ মামলায় তাকে…

    শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের পরও বহাল বিতর্কিত কর্মকর্তারা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। কিন্তু এই অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় গুরুত্বারোপ রাষ্ট্রপতির

    টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় গুরুত্বারোপ রাষ্ট্রপতির

    ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্ট মার্টিন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 9 views
    ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলছে সেন্ট মার্টিন

    কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই, কেন আমার ওপর হামলা হলো: টাইগার শ্রফ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 9 views
    কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই, কেন আমার ওপর হামলা হলো: টাইগার শ্রফ

    স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    নিজের গাড়িতে গুলির ঘটনায় মামলা করলেন আসিফ আকবর

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 8 views
    নিজের গাড়িতে গুলির ঘটনায় মামলা করলেন আসিফ আকবর

    সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি চীনের প্রথম সিনেমা মুক্তি পেল

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৫, ২০২৬
    • 8 views
    সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি চীনের প্রথম সিনেমা মুক্তি পেল