পরীমণির গাড়ি বিতর্কে সেই ‘মাসরুর’ কে? পুরোনো অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উঠছে পরিচয় বিভ্রান্তির প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিনিধিঃ চিত্রনায়িকা তমা মির্জার একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগদানকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও বিনোদন অঙ্গনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনা থেকেই কয়েক বছর আগের পরীমণিকে ঘিরে বহুল আলোচিত গাড়ি বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে ওই ঘটনায় আলোচনায় আসা ‘মাসরুর’ নামের ব্যক্তিকে নিয়ে এখন নতুন প্রশ্ন উঠেছে—তিনি আসলে কে?

২০২১ সালে পরীমণিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের একটি মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। তখন বিভিন্নভাবে ‘মাসরুর’ নামটি সামনে আসে। একপর্যায়ে সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও লেখক মাসরুর আরেফিনের নামও ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে মাসরুর আরেফিন শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার বক্তব্য ছিল, পরীমণির সঙ্গে তার কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই। এমনকি তিনি পরীমণিকে কখনো দেখেননি বলেও দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, তার জীবন মূলত ব্যাংকিং পেশা ও সাহিত্যচর্চাকে ঘিরেই ছিল এবং তিনি এমন কোনো সামাজিক পরিবেশে চলাফেরা করেন না, যেখানে এ ধরনের সম্পর্ক থাকার কথা বলা হচ্ছে।

মাসরুর আরেফিনের বক্তব্যে তখন আরও একটি বিষয় সামনে আসে। ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামে একজনের উল্লেখ করা হয়েছিল। আরেফিন জানান, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে এমন কোনো ব্যক্তি নেই। তার ধারণা ছিল, সেখানে ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নাম ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম পরে প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে পরীমণির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিবেদনে মাসরুর আরেফিনের নাম ভুলভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ‘শওকত রুবেল’ নামটিও ভুল ছিল বলে জানানো হয়। এ কারণে মাসরুর আরেফিন ও তার পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়।

অর্থাৎ ২০২১ সালের ঘটনাপ্রবাহের একটি বিষয় অন্তত পরিষ্কার—পরীমণিকে গাড়ি দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের নাম জড়ালেও পরে সেই নাম প্রকাশের ভুল স্বীকার করা হয়েছিল। ফলে তার বিরুদ্ধে ওই অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো তথ্য ওই ঘটনা থেকে পাওয়া যায় না।

তবে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দাবি সামনে এসেছে। প্রচারিত ওই দাবিতে বলা হচ্ছে, পরীমণিকে গাড়ি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদের বক্তব্যে যে ‘মাসরুর’-এর কথা বলা হয়েছিল, তিনি সিটি ব্যাংকের সাবেক এমডি মাসরুর আরেফিন নন। ওই ব্যক্তি নাকি খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু।

খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী হিসেবে পরিচিত। নতুন করে ছড়ানো এই বয়ানে দাবি করা হচ্ছে, পরীমণির গাড়ি বিতর্কে যে ‘মাসরুর’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি মূলত তার দিকেই ইঙ্গিত করছিল। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিতর্কের আরেকটি দিক হলো তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদের বক্তব্য। বোট ক্লাবকাণ্ডের পর পরীমণিকে দামি গাড়ি দেওয়ার প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ঘিরে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে উল্লেখ করা ‘মাসরুর’ বলতে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুকেই বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু বক্তব্যের সময় নামটি স্পষ্টভাবে না আসা বা পরবর্তীতে অন্য একজনের নাম সামনে চলে আসার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়—এমন ব্যাখ্যাও এখন দেওয়া হচ্ছে।

এই বিতর্কের সঙ্গে ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নামও তখন আলোচনায় এসেছিল। তৎকালীন সময়ে সিটি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক মহলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ছিল। নতুন করে ছড়ানো দাবিতে বলা হচ্ছে, ‘মাসরুর’ নামের এই বিভ্রান্তির কারণে একদিকে প্রকৃত ব্যক্তির পরিচয় আড়ালে থাকতে পারে, অন্যদিকে মাসরুর আরেফিনের নাম সামনে এনে শওকত আজিজ রাসেলের ওপরও চাপ তৈরির চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি বর্তমানে প্রচলিত একটি দাবি; এর সত্যতা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

এর বাইরে আরও একটি গুরুতর দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ঘটনার আগে দুবাইয়ে পরীমণির সঙ্গে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও মিতুর দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে—এমন কথাও প্রচার করা হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া না গেলে এগুলোকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

পরীমণিকে ঘিরে তখন শুধু গাড়ি উপহারের অভিযোগই নয়, বোট ক্লাবের ঘটনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন আইনি জটিলতাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু অভিযোগ, অনুমান ও যাচাই করা তথ্য—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

বিশেষ করে মাসরুর আরেফিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার নাম একসময় পরীমণির গাড়ি বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও তিনি তা সরাসরি অস্বীকার করেন এবং পরে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমও তার নাম ভুলভাবে প্রকাশ করার কথা স্বীকার করে। ফলে তাকে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

অন্যদিকে, খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নাম বর্তমানে নতুন করে আলোচনায় এলেও তার বিরুদ্ধে পরীমণিকে গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। তাই এই পর্যায়ে ‘মাসরুর’ বলতে নিশ্চিতভাবে মিতুকেই বোঝানো হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও প্রমাণ ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

পুরো ঘটনাটি আসলে একটি নামকে ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তির দিকেই ইঙ্গিত করছে। একজনের নাম ভুলভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ব্যক্তিকে নিয়ে সামাজিকভাবে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে ভুল স্বীকার করা হলেও মূল ঘটনার প্রকৃত ব্যক্তিকে নিয়ে প্রশ্নের সমাধান হয়নি। এখন নতুন করে আরেক ব্যক্তির নাম সামনে আসায় পুরোনো বিতর্ক আবার আলোচনায় এসেছে।

পরীমণির গাড়ি বিতর্ক তাই শুধু একটি দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদের বক্তব্য, ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নাম, সিটি ব্যাংকের সাবেক এমডি মাসরুর আরেফিনকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভুল পরিচয়, খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি।

সব মিলিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০২১ সালের সেই আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে কে? নথিভুক্ত ঘটনাপ্রবাহ থেকে মাসরুর আরেফিনের নাম ভুলভাবে সামনে এসেছিল বলে পরবর্তীতে স্বীকার করা হয়েছিল। আর বর্তমানের নতুন বয়ানে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নাম সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি নয়, প্রয়োজন প্রত্যক্ষ তথ্য, নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ।

 

  • Related Posts

    ৬০ কোটি টাকার বিপিসি ভবনে উদ্বোধনের পরই পানি-ফাটল, নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন; তদারকিতে থাকা প্রকৌশলী আপেল মামুনের বিরুদ্ধে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালানোর পর অবশেষে নিজস্ব সদর দপ্তর পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। চট্টগ্রামের জয়পাহাড় এলাকায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচতলা এই…

    তদবির-কমিশনের অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্তের প্রকৌশলী কায়কোবাদ, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদকে ঘিরে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, বদলি ও পদায়নে তদবির এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি,…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ৬০ কোটি টাকার বিপিসি ভবনে উদ্বোধনের পরই পানি-ফাটল, নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন; তদারকিতে থাকা প্রকৌশলী আপেল মামুনের বিরুদ্ধে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৪, ২০২৬
    • 35 views
    ৬০ কোটি টাকার বিপিসি ভবনে উদ্বোধনের পরই পানি-ফাটল, নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন; তদারকিতে থাকা প্রকৌশলী আপেল মামুনের বিরুদ্ধে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ

    তদবির-কমিশনের অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্তের প্রকৌশলী কায়কোবাদ, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৪, ২০২৬
    • 17 views
    তদবির-কমিশনের অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্তের প্রকৌশলী কায়কোবাদ, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

    জিয়া উদ্যানে নেতাকর্মীদের ঢল জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের শ্রদ্ধা

    জিয়া উদ্যানে নেতাকর্মীদের ঢল জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের শ্রদ্ধা

    স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

    স্বামীবাগে খাটের নিচে ৪ বিদেশি পিস্তল, গ্রেফতার ৬

    স্বামীবাগে খাটের নিচে ৪ বিদেশি পিস্তল, গ্রেফতার ৬

    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজির আলীকে ঘিরে নানা অভিযোগ, টেন্ডার থেকে সম্পদ—দাবি নিরপেক্ষ তদন্তের

    • By admin admon
    • আগস্ট ২৪, ২০২৬
    • 15 views
    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজির আলীকে ঘিরে নানা অভিযোগ, টেন্ডার থেকে সম্পদ—দাবি নিরপেক্ষ তদন্তের