বিশেষ প্রতিবেদক: সুনামগঞ্জ সদর থেকে জামালগঞ্জের সাচনা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৯ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ কাটা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার পরও গাছ কাটার কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। উন্নয়নকাজের কথা বলে এসব গাছ দ্রুত কেটে ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের দুই পাশে রেইনট্রি, কড়ই, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৪ হাজার ৮৮৪টি গাছ ছিল। এসব গাছ ২০০৩-০৪ অর্থবছরে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লাগানো হয়েছিল। বন বিভাগের বক্তব্য, গাছগুলোর নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নিয়ম মেনেই নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।
নিলামে জামালগঞ্জ অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। আর সুনামগঞ্জ সদর অংশের গাছ বিক্রি করা হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিপুলসংখ্যক গাছ বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় পরিমাণের গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। ফলে কম দামে গাছ বিক্রি করে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাছ কাটার কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক প্রশস্ত করার জন্য গাছগুলো অপসারণ করা হচ্ছে। কিন্তু সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহর বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তিনি জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এমনকি গাছ কাটার বিষয়েও সওজকে কিছু জানানো হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন।
এ কারণে গাছ কাটার অনুমোদন, এর প্রয়োজনীয়তা এবং বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো প্রকল্প না থাকলে সড়ক প্রশস্ত করার যুক্তিতে কেন এত গাছ কাটা হচ্ছে—এ নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাচ্ছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণ কীভাবে করা হয়েছে এবং নিলাম প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ ঘটনায় হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলনও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় মানুষকে যথেষ্টভাবে অবহিত না করেই তড়িঘড়ি করে গাছ কাটা হচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় গাছগুলোর মূল্য নিলামে পাওয়া ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। ফলে সরকারি সম্পদ কম দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও গাছ কাটা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, বর্তমান জেলা প্রশাসনের সময়ে এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে গাছ কাটার অনুমোদন, নিলাম প্রক্রিয়া, গাছের মূল্য নির্ধারণ, সড়ক প্রশস্ত করার যুক্তি এবং প্রশাসনের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ—সবকিছু নিয়েই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে কোনো সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প না থাকার পরও যদি সেই কারণ দেখিয়ে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশে থাকা এসব গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেনি, পথচারীদের ছায়া দিয়েছে এবং অসংখ্য পাখির আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করেছে। তাই উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী গাছ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গাছ কাটার পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, সরকারি সম্পদের ক্ষতি কিংবা নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।










