তাজ ব্রিকস থেকে ফুলবাড়ীয়া কলেজ— কাস্টমস কর্মকর্তা ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে অনিয়মের নানা অভিযোগ, শত কোটি টাকার সম্পদের প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদক : সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যবসা, জমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে কাস্টমস কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শত কোটি টাকার কথিত অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া, ‘তাজ ব্রিকস’ ইটভাটায় নিয়ম না মানা এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘ চাকরিজীবনে সরকারি বেতন-ভাতা ও ঘোষিত আয়ের তুলনায় ড. তাজুল ইসলাম এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে যে পরিমাণ সম্পদ গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফুলবাড়ীয়া ও আশপাশের এলাকায় জমি, বাড়ি, ব্যবসা এবং অন্যান্য সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে অর্থের উৎস কী ছিল, এসব সম্পদ কেনার টাকা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, শুধু নিজের নামে নয়, পরিবারের সদস্য কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামেও সম্পদ রাখা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ কারও নামে সম্পদ থাকলেই সেটির প্রকৃত অর্থদাতা বা ভোগদখলকারী কে, তা সবসময় সরাসরি বোঝা যায় না। এ কারণে জমির দলিল, নামজারি, খতিয়ান, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ‘তাজ ব্রিকস’। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ইটভাটার কার্যক্রমে জমি ব্যবহারের অনুমতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, সরকারি অনুমোদন, ইটভাটার পরিচালনা এবং কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষ করে ইটভাটাটি যে জমিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেই জমির মালিকানা ও ব্যবহারের বৈধতা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইটভাটার ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে এবং সেই অর্থের সঙ্গে ড. তাজুল ইসলাম বা তার পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ড. তাজুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে জমি কেনাবেচা, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী ও ব্যবসায়িক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে ফুলবাড়ীয়া কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। কলেজের ভর্তি কার্যক্রম, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বার্ষিক বনভোজন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, প্রচার-প্রচারণা এবং বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

কলেজের সাধারণ তহবিল থেকে বিভিন্ন খাতে যে অর্থ খরচ হয়েছে, সেসব ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ বিল-ভাউচার ছিল কি না, কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে এবং গভর্নিং বডির অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক, ল্যাব সহকারী ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, কলেজের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীকে অর্থের বিনিময়ে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যোগ্যতা কী ছিল এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো আর্থিক যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিয়োগসংক্রান্ত সব নথি, আবেদনপত্র, পরীক্ষার ফলাফল, সভার কার্যবিবরণী ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় শুধু নিয়োগ নয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও অন্যান্য কার্যক্রমের ব্যয় নিয়েও অসঙ্গতি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি অর্থ দেখানো হয়েছে কি না, একই ধরনের খাতে একাধিকবার অর্থ ব্যয় হয়েছে কি না এবং বিজ্ঞাপন বা প্রচারের নামে দেওয়া অর্থের যথাযথ হিসাব রাখা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ কারণে কলেজের ব্যাংক হিসাব, ক্যাশবুক, আয়-ব্যয়ের হিসাব, বিল-ভাউচার, অডিট রিপোর্ট, গভর্নিং বডির সভার কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পর্যালোচনা করার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি নিয়োগ পেয়েছেন এবং যারা নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন, তাদের বক্তব্য নিলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

ড. তাজুল ইসলামের সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে ফুলবাড়ীয়া কলেজ ও ‘তাজ ব্রিকস’-এর কার্যক্রমের কোনো আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজের কথিত অনিয়মের অর্থ কোথায় গেছে, কার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থের কোনো অংশ জমি, বাড়ি, ব্যবসা বা অন্য কোনো সম্পদ তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে কি না—এগুলো যাচাই ছাড়া অভিযোগের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় এবং তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে তার উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময়ের চাকরিজীবনের আয়, পারিবারিক আয়, ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থ এবং জমি-বাড়ি কেনার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা হিসাব করে দেখা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে ড. তাজুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি ও ভবনের দলিল, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পর্যালোচনা করলে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ‘তাজ ব্রিকস’-এর অনুমোদন ও আর্থিক হিসাব এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নথিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন এসব অভিযোগ নিয়ে কার্যকরভাবে অনুসন্ধান হয়নি। তবে এখন পুরোনো অভিযোগগুলো আবার সামনে আসায় ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সম্পদ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজে তার দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথিপত্রভিত্তিক অনুসন্ধান করা। আয়কর ও সম্পদ বিবরণী থেকে শুরু করে জমির কাগজপত্র, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব, ইটভাটার অনুমোদন, কলেজের আয়-ব্যয় এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি একসঙ্গে যাচাই করা হলে ড. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং ‘তাজ ব্রিকস’ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন। অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

  • Related Posts

    পদ্মা রেল সংযোগে ১৩,৩৬১ কোটি টাকার অডিট আপত্তি: কাজ কম, বিল বেশি—প্রশ্নের মুখে প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন ও ঠিকাদাররা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ঘিরে সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। ২০টি অডিট আপত্তিতে মোট ১৩ হাজার ৩৬১…

    এলজিইডিতে পদোন্নতির ‘দাম’ ৯ কোটি ৫৫ লাখ, উঠছে বদলি-পদায়নেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ‎স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)–তে পদোন্নতি ঘিরে ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। গত মার্চে ৯০ জন কার্যসহকারীকে সার্ভেয়ার এবং ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সহকারী…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক

    প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক

    তাজ ব্রিকস থেকে ফুলবাড়ীয়া কলেজ— কাস্টমস কর্মকর্তা ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে অনিয়মের নানা অভিযোগ, শত কোটি টাকার সম্পদের প্রশ্ন

    • By admin admon
    • আগস্ট ৩১, ২০২৬
    • 20 views
    তাজ ব্রিকস থেকে ফুলবাড়ীয়া কলেজ— কাস্টমস কর্মকর্তা ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে অনিয়মের নানা অভিযোগ, শত কোটি টাকার সম্পদের প্রশ্ন

    দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে পতন, ভরিতে কমলো কত

    • By admin admon
    • আগস্ট ৩১, ২০২৬
    • 6 views
    দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে পতন, ভরিতে কমলো কত

    দুদকে তলব সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিন আহমেদকে

    • By admin admon
    • আগস্ট ৩১, ২০২৬
    • 6 views
    দুদকে তলব সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিন আহমেদকে

    চোরাচালান ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিজিবিকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতির আহ্বান

    চোরাচালান ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিজিবিকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতির আহ্বান

    কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের পানি দিচ্ছে না ইসরায়েল

    • By admin admon
    • আগস্ট ৩১, ২০২৬
    • 4 views
    কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের পানি দিচ্ছে না ইসরায়েল