নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একটু পরিচয়, এরপর গল্প। সহযাত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। কখনো খাবার, কখনো পানীয় দেওয়ার প্রস্তাব। আস্থা তৈরি হলেই সুযোগ বুঝে চেতনানাশক দ্রব্য প্রয়োগ। কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেতন যাত্রী। আর সেই সুযোগে টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে উধাও চক্রের সদস্যরা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন যাত্রাপথে বহুদিন ধরে এভাবেই সক্রিয় অজ্ঞান পার্টি। সর্বশেষ গত এক বছরে তাদের খপ্পরে পড়ে সারা দেশে ৩২ জন মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বাস, ট্রেন, টার্মিনাল ও জনাকীর্ণ এলাকায় যাত্রীদের টার্গেট করা হলেও এখন অন্যতম টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন অটোরিকশা চালকরা। রাজধানীতে গত আট মাসে তিন জন অটোরিকশা চালককে হত্যা করা হয়েছে। তিনটি ঘটনাতেই অটোরিকশা লুট করা হয়েছে। এই চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
নিরাপত্তাহীন চালকেরা: রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো অটোরিকশাচালক জীবিকার তাগিদে বের হন। যাত্রী বহন করতে গিয়ে কখনো তারা হয়ে উঠছেন অজ্ঞান পার্টি চক্রের টার্গেট। তাদের হামলায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে অন্তত তিন জন অটোরিকশাচালক নিহত হয়েছেন। তিনটি ঘটনার ধরনও এক নয়। একজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, একজনকে অচেতন করার পর হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে এবং আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে মাটিচাপা অবস্থায়।
গত ১০ মার্চ রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ ভাঙারি গলি এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মালিক সিকান্দার মিয়াকে কয়েক জন ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২৮ জুন রাত ৯টার দিকে খিলগাঁও থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন দিদারুল ইসলাম। পরদিন ভোরে ওয়ারীর নবাবপুর রোড এলাকা থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ জুলাই রাতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, যাত্রী সেজে অটোরিকশায় উঠে চালককে অচেতন করে অটোরিকশা ছিনতাই করে একটি চক্র। সিসিটিভি বিশ্লেষণের পর কয়েক জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দিদারুলের ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি সিএনজি উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া জুলাইয়ে পূর্ব বাড্ডার অটোরিকশাচালক অলিউর রহমান ওরফে অলি নিখোঁজ হন। কয়েক দিন পর উলারটেক এলাকায় একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে তার মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দিদারুলের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা অজ্ঞান পার্টির সক্রিয় সদস্য বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যাত্রী সেজে রিকশা বা অটোরিকশায় ওঠা, চালকের সঙ্গে সখ্য তৈরি করা এবং সুযোগ বুঝে তাকে অচেতন করে যানবাহন নিয়ে পালিয়ে যাওয়াই তাদের কৌশল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রিকশা ও অটোরিকশা চালকদের নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, রাতে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহজনক যাত্রীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং চালকদের জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চুরি বা ছিনতাই হওয়া রিকশা দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে পুরোনো যানবাহনের কেনাবেচাতেও নজরদারি বাড়াতে হবে।








