বিশেষ প্রতিবেদকঃ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর—ডিআইএতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা আব্দুস সালাম আজাদ। নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর তাকে ডিআইএর যুগ্ম পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়। তবে পদায়নের কয়েক দিন পরও আদেশটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ৩ সেপ্টেম্বর তিনি ডিআইএতে যোগদান করেছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন বা বদলির আদেশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সালাম আজাদের ক্ষেত্রে আদেশ প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, আগে তাকে কর্মস্থলে যোগদান করিয়ে পরে আদেশ অনলাইনে প্রকাশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও আপত্তি উঠেছে বলে জানা গেছে।
পদায়নসংক্রান্ত যে আদেশ হাতে এসেছে, সেখানে সালাম আজাদকে তার বর্তমান কর্মস্থল জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি—নায়েম থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তার ডিআইএতে যোগদানকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি বিতর্ক সামনে আসার পর তার পদায়ন বাতিল হতে পারে—এমন কথাও সংশ্লিষ্ট মহলে ছড়িয়েছে।
আব্দুস সালাম আজাদ এর আগে দীর্ঘ সময় ডিআইএতে কাজ করেছেন। তার ব্যক্তিগত নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে তিনি এই দপ্তরে পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তাকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের সুপারিশে ডিআইএতে পদায়ন করা হয়েছিল—এমন তথ্য তার ব্যক্তিগত ফাইলে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ওই সময়কার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে বর্তমান সময়ে আবারও ডিআইএর গুরুত্বপূর্ণ পদে কেন আনা হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিআইএতে আগের দায়িত্ব পালনের সময় সালাম আজাদের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ, জাল সনদ কিংবা আর্থিক অসঙ্গতি শনাক্ত করার পর সেগুলো নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। এমনকি পরিদর্শন বা অডিট প্রতিবেদনের তথ্য পরিবর্তন এবং অনুকূলে রিপোর্ট দেওয়ার বিনিময়েও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। সালাম আজাদ নিজেও ঘুষ নেওয়া কিংবা পদায়নের জন্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগের কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজান হামলা-সংক্রান্ত মামলার তদন্তের সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছিল—এমন তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত নথি প্রতিবেদকের হাতে নেই।
সালাম আজাদের ভাই আবুল কালাম আজাদও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। ব্যক্তিগত নথিতে তার ভাইয়ের প্রভাব ব্যবহার করে সালাম আজাদ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়েছিলেন—এমন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সামনে আসার পর ২০১৯ সালে সালাম আজাদকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে পদায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে শাস্তিমূলক বা ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’ হিসেবে দেখেন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাখ্যায় সালাম আজাদ ভিন্ন কথা বলেছেন। পদায়নের আদেশ ওয়েবসাইটে কেন প্রকাশ করা হয়নি—এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। আদেশের কপি তিনি কীভাবে পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, তার এক শুভাকাঙ্ক্ষী হোয়াটসঅ্যাপে সেটি পাঠিয়েছেন।
২০১৩ সালে ডিআইএতে পদায়নের সময় কোনো মন্ত্রীর সুপারিশ নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। বরং তার দাবি, ডিআইএতে যোগ দেওয়ার পর তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক বিপুল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে তার রাজনৈতিক আদর্শের মিল না থাকায় তাকে ঠিকমতো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। নিজের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সালাম আজাদ বলেন, তার কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই এবং তিনি সম্পূর্ণ নির্দলীয়।
এবারের পদায়ন প্রসঙ্গে সালাম আজাদের বক্তব্য হলো, তিনি নিজেই ডিআইএতে কাজ করার জন্য আবেদন করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিআইএর বর্তমান পরিচালক নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তাকে সহযোগিতা করার জন্য দপ্তর সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজন কর্মকর্তার প্রয়োজন ছিল। সালাম আজাদ আগে প্রায় পাঁচ বছর ওই দপ্তরে কাজ করায় তাকে আবার সেখানে পদায়ন করা হয়েছে।
সালাম আজাদের দাবি, তিনি এবার ডিআইএতে গিয়ে দপ্তরটির বিতর্ক দূর করতে কাজ করতে চান। তার ভাষায়, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেটিকে ঘুষ ও অনিয়ম থেকে বের করে আনাই তার উদ্দেশ্য। তবে এর বিপরীতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে তার পদায়নকে ঘিরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লেনদেনের গুঞ্জন রয়েছে। যদিও এই অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সালাম আজাদ সরাসরি এমন অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
সালাম আজাদের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ। পিডিএসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালের ২২ মে থেকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এরপর তাকে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি—নায়েমে ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন এবং বর্তমানে নায়েমেই কর্মরত আছেন।
তবে তোলারাম কলেজে দায়িত্ব পালন নিয়েও তার বিরুদ্ধে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কলেজ থেকে তাকে বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব তৈরি করে সেই বদলি ঠেকানো হয়েছিল। তবে কারা ওই মব তৈরি করেছিল, কীভাবে সেটি করা হয়েছিল কিংবা বদলি বাতিলের পেছনে কার ভূমিকা ছিল—এসব বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
ডিআইএ মূলত দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিদর্শন এবং নিরীক্ষার দায়িত্ব পালন করে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ, সনদ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম আছে কি না, তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে এই দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই ডিআইএর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরিদর্শনের সুযোগকে ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে নিয়োগ, নিয়মবহির্ভূত শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম বা অন্য কোনো দুর্নীতির ঘটনা ধরা পড়লে তা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত বা অডিট রিপোর্টে নেতিবাচক তথ্য থাকলে অর্থের বিনিময়ে সেই রিপোর্ট পরিবর্তন কিংবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পুরনো অভিযোগে বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে আবারও একই দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পদায়নের আদেশ অনলাইনে প্রকাশ না করা এবং যোগদানের বিষয়টি সামনে আসার পর আলোচনাটি আরও জোরালো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, সালাম আজাদকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি নানা অভিযোগের কথা শুনছেন। তবে তার পদায়ন নিয়ম অনুযায়ী আদিষ্ট হয়ে করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পদায়নের পেছনে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান।
সব মিলিয়ে, পুরনো অভিযোগ, রাজনৈতিক সুপারিশের বিতর্ক, ডিআইএতে আগের দায়িত্ব পালনের সময় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ, ভাইয়ের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ এবং এবার পদায়নের আদেশ প্রকাশ না হওয়া—সবকিছু মিলিয়ে আব্দুস সালাম আজাদের নতুন দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি এবং তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।










