রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত আইরিন খানের

image_pdfSaveimage_print

ডেস্ক নিউজঃ জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের অবসানে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি রোডম্যাপ এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য আরও মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দেন।

নিউইয়র্ক থেকে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইরিন খান বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে যে বিষয়টি ব্যর্থ হচ্ছে, তা হলো- প্রথমত, এই ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে সহায়তা করার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার; দ্বিতীয়ত, দেশের একটি অত্যন্ত কঠিন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করা; এবং তৃতীয়ত, এই জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা।’

অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যর্থ হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে আইরিন খান বলেন, শরণার্থীদের সহায়তা, বাংলাদেশকে সমর্থন এবং সংকটের সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের ঘাটতিই এর মূল কারণ।

আইরিন খান বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের জনাকীর্ণ শিবিরে তারা বসবাস করছে।

তিনি বলেন, ‘সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন, কিন্তু এর পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বর্তমানে মানবিক সহায়তাও কমে আসছে।’

আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গারা নয় বছর ধরে শিবিরগুলোতে বসবাস করছে। সেখানে শিশুরা বেড়ে উঠছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘তারা যাবে কোথায়? একটি শিবিরে নয় বছর থাকা অনেক দীর্ঘ সময়।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং এ অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এ সংকটের সমাধান নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার উৎস মিয়ানমারে এবং আমরা বিশ্বাস করি, এর সমাধানও সেখানেই রয়েছে।’

রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা ‘নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে’ ফিরে যেতে চায়।

বাংলাদেশ কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার প্রত্যাশা করে- এমন প্রশ্নের জবাবে আইরিন খান জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সব অংশীজনকে আলোচনার টেবিলে আনার আহ্বান জানান।

তিনি বাংলাদেশ, মিয়ানমার, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহ করতে পারে- এমন দেশগুলোর কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চাই, যেখানে মিয়ানমার সরকারকে তার দায়িত্বের কথা, তার আইনগত দায়িত্বের কথা, স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে- যাতে তারা তাদের জনগণকে ফিরিয়ে নেয়। একইসঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন সহায়তা প্রয়োজন, যা মানুষের ফিরে যাওয়ার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।’

বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইরিন খান বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে, বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোকে।

তিনি বলেন,‘আমাদের সত্যিই প্রয়োজন এসব সরকার আরও কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করুক।’

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিপুলসংখ্যক দেশ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে এবং কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে আস্থাশীল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নে বৈশ্বিক অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এসে এখন তা অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : অ্যা রিনিউড কল ফর অ্যা ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘সহমর্মিতা থেকে মূল কারণ ও এর সমাধান খোঁজার দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে পদক্ষেপের দিকে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে তা অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।’

প্রধানমন্ত্রীর পাঁচটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন; রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থা জোরদার করা; এবং মাদকনির্ভর অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

  • Related Posts

    ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি

    রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে গিয়েছেন। আজ শুক্রবার সকালে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। এ সময়…

    সৌদিতে নিহত শাহেদের মরদেহ গ্রহণ করলেন শামা ওবায়েদ

    সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শাহেদের মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধী দল ধোঁকাবাজি করেছে’

    ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধী দল ধোঁকাবাজি করেছে’

    ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি

    ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি

    তিব্বতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, তাইওয়ানেও ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন

    তিব্বতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, তাইওয়ানেও ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন

    সৌদি-হুতি সংঘাত: উল্লেখযোগ্য যা যা ঘটল

    সৌদি-হুতি সংঘাত: উল্লেখযোগ্য যা যা ঘটল

    সৌদিতে নিহত শাহেদের মরদেহ গ্রহণ করলেন শামা ওবায়েদ

    সৌদিতে নিহত শাহেদের মরদেহ গ্রহণ করলেন শামা ওবায়েদ

    আসামি নিয়ে ফেরার পথে কাভার্ডভ্যানচাপায় এসআই ও বিএনপি নেতা নিহত

    আসামি নিয়ে ফেরার পথে কাভার্ডভ্যানচাপায় এসআই ও বিএনপি নেতা নিহত