বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে পণ্য ছাড়ে অযথা দেরি, ফাইল আটকে রাখা এবং অনৈতিকভাবে টাকা আদায়ের চাপ তৈরির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারী। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে পণ্য ছাড়ের কাজ দীর্ঘায়িত করায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটিসহ পাঁচটি আনস্টাফিং গেটকে কেন্দ্র করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতিটি গেট থেকে সপ্তাহে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। এভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও পণ্য খালাসের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক পণ্য ছাড় করাতে গিয়ে সিএন্ডএফ কর্মচারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে বাধার মুখে পড়তে হয়। পণ্য খালাসের জন্য সহকারী কমিশনার ওমর কাউসারের অনুমতি প্রয়োজন বলে জানিয়ে তাঁদের তাঁর কার্যালয়ে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গেটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা পণ্য পরীক্ষা করার পরও আবার পরীক্ষা করার কথা বলে ছাড়পত্র দিতে দেরি করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, এভাবে একই পণ্য নিয়ে বারবার যাচাইয়ের কথা বলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সিএন্ডএফ কর্মচারীদের অভিযোগ, কোনো দিন পণ্য পরীক্ষা না করে পরদিন আসতে বলা হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকার পরও ফাইল আটকে রাখা হয়। এতে পণ্য খালাসের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। বন্দরে পণ্য পড়ে থাকলে ডেমারেজসহ বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই আর্থিক চাপের কারণে কিছু ব্যবসায়ী ও তাঁদের প্রতিনিধিরা বাধ্য হয়ে অনৈতিক অর্থের দাবি মেনে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েন।
এমবিবি আনস্টাফিং গেটের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, তিনি নিয়মিত সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং পণ্য ছাড়ের কাজ বিলম্বিত হওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট নথি, পণ্য পরীক্ষার সময়সূচি, ফাইল নিষ্পত্তির তথ্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারীর অভিযোগ, পণ্য ছাড়ের কাজে দেরি হলে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকেন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পণ্য দ্রুত ছাড় করানোর তাগিদে ব্যবসায়ীরা একদিকে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে তাঁদের পণ্য কখন পরীক্ষা করা হবে বা কখন ছাড়পত্র পাওয়া যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানোর পর এবং সংবাদ প্রকাশের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং তাঁদের হয়রানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সিএন্ডএফ কর্মচারী। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেশির ভাগ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে জানানো হয় যে পণ্য পরদিন পরীক্ষা করা হবে। ফলে পণ্য ছাড়ের জন্য আরও এক দিন অপেক্ষা করতে হয় এবং ডেমারেজসহ অতিরিক্ত খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের বিলম্বের কারণে পণ্য দ্রুত ছাড় করাতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপও তৈরি হয়।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, ফাইল আটকে থাকার কারণ, গেটভিত্তিক কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব ক্ষেত্রে পণ্য ছাড়ে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে, সেগুলোর কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো পণ্য পরীক্ষা বা ছাড়পত্রের জন্য অতিরিক্ত যাচাই দরকার হলে তার কারণ ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট থাকা উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা অযথা হয়রানির শিকার না হন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা দরকার। তদন্তে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ সম্পর্কে কী জানে, কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কি না এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সহকারী কমিশনার ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণই হতে পারে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার কার্যকর উপায়।









