সংরক্ষিত বন উজাড়ের অভিযোগ, খেয়াচল্যং রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার রাশেদুজ্জামানকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বান্দরবানের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের খেয়াচল্যং রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া জোত পারমিট তৈরি, একই হোল্ডিং একাধিকবার ব্যবহার এবং সরকারি কাগজপত্রের আড়ালে মূল্যবান গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়ে একটি কাঠ ব্যবসায়ী চক্রকে সহায়তা করছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০টি জোত পারমিট অনুমোদনের বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান বন বিভাগের সাবেক ডিএফও মোহাম্মদ আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত রাশেদুজ্জামান শুরুতে সদর রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে ডেপুটি রেঞ্জার কাজী মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার দেনদরবারও করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সেখানে সফল না হয়ে পরবর্তী সময়ে রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম খেয়াচল্যং রেঞ্জের দায়িত্ব নেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ওই এলাকার বনজ সম্পদ নিয়ে অনিয়মের কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সরেজমিনে কার্যালয়টিতে গিয়ে প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামানসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকেই সেখানে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রেঞ্জের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না। এমনকি রেঞ্জ এলাকায় তাঁদের স্থায়ী বা ভাড়াটিয়া আবাসনের ব্যবস্থাও নেই। তাঁরা অধিকাংশ সময় বান্দরবান জেলা শহরে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে দুর্গম এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেখভাল, অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব কার্যত অবহেলিত হয়ে পড়েছে।

তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে জোত পারমিট অনুমোদনকে কেন্দ্র করে। খেয়াচল্যং রেঞ্জের আওতাধীন ৩১৭ নম্বর ক্যাচলং মৌজা এবং ৩৪৯ নম্বর ঘেরাউ মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের সংখ্যা সীমিত। এসব মৌজায় আগেও একাধিকবার জোত পারমিটের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এরপরও রাশেদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ২০টি জোত পারমিট অনুমোদন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, গাছের প্রকৃত সংখ্যা এবং কাঠের পরিমাণ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।

অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরেজমিনে গাছ শনাক্ত ও পরিমাপ না করেই কিছু ক্ষেত্রে পারমিট তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুয়া এ-ফরম তৈরি করে জোতের মালিকানা ও গাছের হিসাব দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। একই মৌজা ও একই হোল্ডিং নম্বর ব্যবহার করে একাধিকবার কাগজপত্র তৈরি করার অভিযোগও উঠেছে।

এভাবে কাগজে-কলমে বৈধ জোত দেখিয়ে বাস্তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কাটার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ, জেলা শহরে বসেই কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গাছের খাড়া মার্কা ও পাশ মার্কা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারি নিয়মের বাইরে মূল্যবান বনজ সম্পদ কেটে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

এই কর্মকাণ্ডের ফলে বান্দরবানের বন ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, বৈলাম, গর্জন ও শিউরীর মতো মূল্যবান ও পুরোনো গাছ নির্বিচারে কাটার অভিযোগ রয়েছে। এসব বড় গাছ বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছ কমে যাওয়ায় এশীয় হাতি, মায়াহরিণ ও বিরল প্রজাতির উল্লুকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বন উজাড়ের কারণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাতও বাড়তে পারে।

পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ের গাছপালা কমে গেলে বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের ঝিরি ও ছড়ার পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খেয়াচল্যং এলাকার বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ, সরকারি কাগজপত্রের সুযোগ নিয়ে দরিদ্র ও সাধারণ পাহাড়ি মানুষের নাম ব্যবহার করে কৃত্রিম জোত ও হোল্ডিংয়ের কাগজ তৈরি করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত জমির মালিকেরা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে কিছু বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি চক্র সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ সংগ্রহ ও বাণিজ্য পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি অভিযোগকারীদের।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি দুর্গম রেঞ্জ কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক জোত পারমিট অনুমোদনের বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৩১৭ নম্বর ক্যাচলং ও ৩৪৯ নম্বর ঘেরাউ মৌজায় গত ছয় মাসে অনুমোদিত ২০টি পারমিটের নথি, এ-ফরম, হোল্ডিংয়ের মালিকানা, গাছের পরিমাপ এবং খাড়া ও পাশ মার্কা দেওয়ার রেকর্ড যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

এ ঘটনায় ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান, সাবেক ডিএফও মোহাম্মদ আবদুর রহমান এবং ডেপুটি রেঞ্জার কাজী মো. সাইফুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে অভিযোগে যেসব তথ্য এসেছে, সেগুলোও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বনাঞ্চল রক্ষা, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা এবং স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের দাবি, রাশেদুজ্জামানের দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুমোদিত সব জোত পারমিটের নথি পরীক্ষা করে অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে বান্দরবানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

  • Related Posts

    রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় খাদ্য কর্মকর্তা জিকরুল আলম

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের বিরুদ্ধে চাকরিতে নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে…

    চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে পাইলের গভীরতা ও ব্যাস কমিয়ে কাজের অভিযোগ, ভুয়া MB-তে বিল উত্তোলন ও অর্থ ভাগাভাগির বিতর্কে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ব্রহ্মপুত্রের তীরে একটি আধুনিক নদীবন্দর। লক্ষ্য—ভারতের সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য বাড়ানো, উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক করিডোর শক্তিশালী করা এবং নদীপথের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। কিন্তু সেই অবকাঠামোর মাটির নিচের ভিত্তি নিয়েই উঠেছে গুরুতর…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সংরক্ষিত বন উজাড়ের অভিযোগ, খেয়াচল্যং রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার রাশেদুজ্জামানকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 10 views
    সংরক্ষিত বন উজাড়ের অভিযোগ, খেয়াচল্যং রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার রাশেদুজ্জামানকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

    রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় খাদ্য কর্মকর্তা জিকরুল আলম

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 11 views
    রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় খাদ্য কর্মকর্তা জিকরুল আলম

    চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে পাইলের গভীরতা ও ব্যাস কমিয়ে কাজের অভিযোগ, ভুয়া MB-তে বিল উত্তোলন ও অর্থ ভাগাভাগির বিতর্কে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 12 views
    চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে পাইলের গভীরতা ও ব্যাস কমিয়ে কাজের অভিযোগ, ভুয়া MB-তে বিল উত্তোলন ও অর্থ ভাগাভাগির বিতর্কে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম

    গণপূর্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া ও পার্কের ফল বিক্রির টাকায় অনিয়মের অভিযোগ

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 15 views
    গণপূর্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া ও পার্কের ফল বিক্রির টাকায় অনিয়মের অভিযোগ

    শ্রীমঙ্গলের ভূমি অফিস থেকে সিলেট জেলা প্রশাসন—শ্রীপদ দেবের শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, একাধিক মামলা সত্ত্বেও পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 16 views
    শ্রীমঙ্গলের ভূমি অফিস থেকে সিলেট জেলা প্রশাসন—শ্রীপদ দেবের শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, একাধিক মামলা সত্ত্বেও পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক

    সংসদে সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয় ও অনিয়মের অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি, তদন্তের মধ্যেই গণপূর্তের কঠোর পদক্ষেপ

    • By admin admon
    • নভেম্বর ১, ২০২৬
    • 26 views
    সংসদে সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয় ও অনিয়মের অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি, তদন্তের মধ্যেই গণপূর্তের কঠোর পদক্ষেপ