বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন-৫-এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিভিন্ন কৌশলে ওয়াসার রাজস্ব ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। তার কর্মকাণ্ডের কারণে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ক্ষতির পাশাপাশি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, আনোয়ারুল ইসলাম প্রথমে ঢাকা ওয়াসার পিপিআই রাজস্ব জোনে আউটসোর্সিং বিলিং সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি তৎকালীন সিবিএ সভাপতি ও আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতা সামসুজ্জামানের পারিবারিক আত্মীয় হওয়ায় বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামসুজ্জামানের মেয়ের জামাই হওয়ায় শ্বশুরের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি অফিসে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় থেকেই আন্ডার বিলিং, পানির মিটারে কারসাজি (মিটার টেম্পারিং) এবং অবৈধ পানির সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসব কাজের বিনিময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে থাকা অবস্থায় আনোয়ারুল ইসলাম নিয়মিত নিজের দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া অন্য একজনকে দিয়ে অফিসের কাজ করাতেন। এভাবে সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করেও তিনি কোনো জবাবদিহির মুখে পড়েননি। বরং শ্বশুরের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতেন। একই সময় তৎকালীন সিবিএ নেতার ভাতিজা ফাহাদ আল রশীদ এবং নেতার শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে ওয়াসার ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
পরবর্তীতে স্থায়ী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) পদে নিয়োগের সময়ও আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বন করে এবং প্রভাবশালী আত্মীয়ের সহযোগিতায় তিনি স্থায়ী পদ লাভ করেন। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পরিধি আরও বাড়তে থাকে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনি যেসব রাজস্ব জোনে দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই ঘুষ ও অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছিলেন। তার অধীনস্থ রাজস্ব পরিদর্শক ও বিলিং সহকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘুষের বিনিময়ে লাভজনক সাইট বা দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র পরিচালনা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সৎ কর্মকর্তারা নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকতেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া হেড অফিসের সেন্ট্রাল ফাংশনে কর্মরত থাকাকালে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ নথি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ফাইল সরিয়ে ফেলার কারণে কয়েকটি অভিযোগ আর তদন্তের পর্যায়ে এগোয়নি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব পরিদর্শক হারুনুর রশিদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে আনোয়ারুল ইসলামকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত চলাকালে হারুনুর রশিদ রানার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তার পক্ষে অনুকূল প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সংযোগ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আনোয়ারুল ইসলাম বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্বল্প বেতনের একজন কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অভিযোগ রয়েছে, তার অর্জিত সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








