বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার পানি (পূর্ব ও উত্তর) বিভাগ-২-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অপসারিত ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম বেপারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নূর হোসেন বিভিন্ন সময় তার প্রভাব ব্যবহার করে ওয়াসার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চাকরি থেকে প্রাপ্ত বৈধ আয়ের তুলনায় নূর হোসেনের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক। তিনি ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক হয়েছেন। এছাড়া গ্রামের বাড়িতেও বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নিজের নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, তার এবং পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান করলে এসব অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে।
নূর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারিফ ট্রেডিং কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোঃ মজিবুল হাসানকে ব্যবসায়িক অংশীদার বানানো এবং ওয়াসার টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় মজিবুল হাসান অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে এক অফিস আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। একই ঘটনায় মজিবুল হাসান বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় নূর হোসেনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে সুবিধাজনক কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে নূর হোসেন ঢাকা ওয়াসায় চাকরি পান। এরপর রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন নানা অনিয়মের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। তার আগের কর্মস্থল পাগলা পয়ঃশোধনাগার বিভাগে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একজন নিরীহ প্রকৌশলীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
নূর হোসেনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি শোক দিবসসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আয়োজনে নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের উদ্যোগে প্রকৌশলীদের করণীয় বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারেও নূর হোসেন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আইইবির কাউন্সিল রুমে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং আইইবির তৎকালীন সভাপতি প্রকৌশলী আব্দুস সবুর।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ জুম সভায়ও নূর হোসেন অংশ নেন। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই জুম মিটিংয়ের রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করলে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এদিকে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








