গণপূর্তের সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদের অভিযোগ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও প্রভাব খাটানোর নানা প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানকে ঘিরে বিপুল সম্পদ অর্জন, ঠিকাদারি ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেওয়ার নানা অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি খুলনা জোনের দায়িত্বে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার সময় ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি সময়ের সুযোগ নিয়ে সাইফুর রহমান গণপূর্তের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। এর মধ্যে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও ছিল। এসব পদে থাকাকালে সরকারি প্রকল্পের কাজ, বিল পরিশোধ এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে তার প্রভাব ছিল বলে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন।

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কে ঘিরে। একাধিক ঠিকাদারের দাবি, ওই সময়ে বিভাগটিতে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীর প্রভাব তৈরি হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ওই গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল। এমনকি নির্দিষ্ট হারে অর্থ না দিলে ফাইলের কাজ এগোত না—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের একজনের দাবি, বিভিন্ন ফাইলে স্বাক্ষর বা কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অর্থ দাবি করা হতো। আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে একজন নারী হিসাব সহকারীকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, সাইফুর রহমানের সম্পদের পরিমাণ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে তার দুটি বিলাসবহুল বাড়ি থাকার কথা জানা গেছে। পাশাপাশি পূর্বাচলে প্লট, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকায় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং বাজার রোড এলাকায় তিনতলা একটি মার্কেটের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে বাজার রোডের মার্কেটটি নিজের নয়, ভাইয়ের—এমন দাবি করেছেন সাইফুর রহমান।

এছাড়া সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড় এলাকায় আগে একটি এলপিজি ফিলিং স্টেশন ছিল এবং বর্তমানে সেখানে ‘সোনারতরী পার্ক’ নামে একটি স্থাপনার কথা জানা গেছে। এর কাছাকাছি প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমিতে ‘কাঠবাদাম’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে সাইফুর রহমানের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তার মেয়ে বসবাস করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। দেশ-বিদেশে থাকা এসব সম্পদ, ব্যবসা ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বিবেচনায় নিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সম্পদের সঠিক পরিমাণ এবং বৈধ উৎস নির্ধারণের জন্য সরকারি নথি, আয়কর তথ্য, ভূমি রেকর্ড ও ব্যাংকিং লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক ঠিকাদার জিকে শামীম এবং গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়া এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তারের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। এমনকি হোটেল রেডিসান ও ওয়েস্টিনে তাদের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময়ও সাইফুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন দমনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছিলেন। এমনকি আন্দোলন ঘিরে সহিংস কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল—এমন কথাও বিভিন্ন মহলে শোনা যায়।

সব মিলিয়ে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে তার সম্পদ, ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সময়কার কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে তার আয়-ব্যয়, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, ভূমি ও কোম্পানি সংক্রান্ত নথি এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি টাঙ্গাইলের সম্পদগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং এজমালি সম্পত্তি বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে অন্যান্য অভিযোগকে সত্য নয় বলে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ভিত্তি নেই।

তবে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা বিপুল সম্পদের অভিযোগ, ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত সত্য জানতে প্রয়োজন নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত। তদন্তে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও পরিষ্কার করা সম্ভব হবে।

  • Related Posts

    বরিশাল বিআরটিএতে ফেল করেও মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স, সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বরিশাল আঞ্চলিক বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহন নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে। অভিযোগ…

    মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে, তিন মাসে ৫৮ কোটি টাকা রাজস্ব ও জরিমানা আদায়

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতা বাড়ছে। শুল্ক ফাঁকি দিতে আমদানিকারকদের একটি অংশ পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, পরিমাণ ও মূল্য গোপন করে পণ্য খালাসের চেষ্টা করছে। তবে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সৌদি আরবের পৃথক বিমান হামলায় ইয়েমেনে ৭ জন নিহত

    • By Sara
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 28 views
    সৌদি আরবের পৃথক বিমান হামলায় ইয়েমেনে ৭ জন নিহত

    টেকনাফে মানবপাচার চক্রের গুলিতে সেনাসদস্য আহত, উদ্ধার ৫৭: আইএসপিআর

    • By Sara
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 26 views
    টেকনাফে মানবপাচার চক্রের গুলিতে সেনাসদস্য আহত, উদ্ধার ৫৭: আইএসপিআর

    ভুটানকে হারিয়ে সাফে শুভসূচনা বাংলাদেশের

    • By Sara
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 26 views
    ভুটানকে হারিয়ে সাফে শুভসূচনা বাংলাদেশের

    জামিন পেলেন পরীমণি

    • By Sara
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 23 views
    জামিন পেলেন পরীমণি

    বরিশাল বিআরটিএতে ফেল করেও মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স, সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 29 views
    বরিশাল বিআরটিএতে ফেল করেও মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স, সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

    মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে, তিন মাসে ৫৮ কোটি টাকা রাজস্ব ও জরিমানা আদায়

    • By admin admon
    • নভেম্বর ৫, ২০২৬
    • 32 views
    মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে, তিন মাসে ৫৮ কোটি টাকা রাজস্ব ও জরিমানা আদায়