দুদকের মামলা, অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা—তারপরও পাবনায় নিয়মিত অফিস করছেন আলতাব হোসেন

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) একজন সহকারী পরিচালক মাত্র তিনি। কিন্তু এই সহকারী পরিচালকেরই এত ক্যারিশমা! নানা অবৈধ পথে কামিয়েছেন অন্তত শত কোটি টাকা। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলেছেন নামে-বেনামে বাড়ি ও প্লট। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে বিশাল ভূসম্পত্তি।

বিদেশেও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ তো রয়েছেই।

এই আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করে প্রায় চার বছর আগে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়।

প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন ও পৌনে তিন কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এই মামলা করে দুদক। এরপরে মামলায় চার্জশিট হয়। আলতাব হোসেন এবং তার স্ত্রীর সম্পত্তিও ক্রোক হয়।

কিন্তু এত কিছুর পরও আলতাব হোসেন চাকরিতে বহাল তবিয়তেই থেকে যান। সড়ক মন্ত্রণালয় বা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যদিও সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দুদকের মামলা দায়েরের পরপরই তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত অথবা প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করার নিয়ম রয়েছে।

শুধুমাত্র মামলা এবং সম্পত্তি ক্রোকই নয়, অবশেষে সহকারী পরিচালক আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত গত এপ্রিল মাসে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। অবাক ব্যাপার হলো, তারপরও আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিআরটিএ বা মন্ত্রণালয়। তিনি এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছেন বিআরটিএ পাবনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক পদে।

আরও অবাক ব্যাপার হলো, গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পাবনা পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই তিনি নিয়মিত সার্বক্ষণিকভাবে অফিস করছেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না, বিআরটিএ বা মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। সবকিছু দেখেও তারা না দেখার ভান করে আছেন। শত কোটি টাকার মালিক আলতাব হোসেনের এটাই বড় কৃতিত্ব বা ক্যারিশমা!

দুদকের অনুসন্ধানে বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার নামে ঢাকা ও ফরিদপুরে মোট ১৭টি স্থানে জমি, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্তানদের তথ্য এর মধ্যে আসেনি। আলতাব হোসেনের নামে ফরিদপুরে ১২টি স্থানে জমি রয়েছে, যার মোট মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। যদিও বাস্তবে এর মূল্য অনেক গুণ বেশি।

কাগজপত্রে সবচেয়ে হাস্যকর মূল্য দেখানো হয়েছে ঢাকার গুলশানের বাড়ি ও প্লটের। গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় আলতাব হোসেনের একটি প্লট ও বাড়ি আছে, কাগজপত্রে যার মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অথচ এই বাড়ি ও প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত শত কোটি টাকা।

অন্যদিকে, স্ত্রী জিয়াসমীনের নামেও ঢাকায় দুটি প্লট ও বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এছাড়া ফরিদপুরে আরও দুটি প্লট ও জমি রয়েছে, যার মূল্য ৩ লাখ টাকা। আলতাবের স্ত্রী জিয়াসমীনের নামে থাকা এসব সম্পত্তির বর্তমান মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা, বলছেন দুদক কর্মকর্তারা। যদিও দুদকের মামলায় সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। কাগজপত্রে উল্লেখ থাকা মূল্যের হিসাবই দেখানো হয়েছে দুদকের মামলায়।

২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ সংস্থাটির উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেন। প্রথম মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামি মো. আলতাব হোসেন দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৩ টাকার সম্পদ (স্থাবর ও অস্থাবর) গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করেছেন। অন্যদিকে, দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৩ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরাকে প্রধান আসামি ও তার স্বামী আলতাব হোসেনকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। বিবরণে দেখা যায়, জিয়াসমীন তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯ টাকার সম্পদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করেছেন। আর দুদকের অনুসন্ধানে তার নামে ২ কোটি ৪২ লাখ ২ হাজার ২৫১ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গৃহিণী হিসেবে এত সম্পদ করা অসংগতিপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে এসব সম্পদ তার স্বামী মো. আলতাব হোসেনের দুর্নীতির টাকায় গড়েছেন। সে কারণে তাকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে এ মামলায়। তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

এই দুই মামলায় চার্জশিট হয় এবং পরবর্তীতে এক পর্যায়ে আদালত আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। আদালত ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ সাব্বির ফায়েজের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। আদালত বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার ১৭টি স্থানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। অবশ্য, সন্তানদের নামে ক্রয় করা এবং আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বেনামে ক্রয় করা সম্পত্তিগুলো রয়ে গেছে এই ক্রোক আদেশের বাইরে।

তবে সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও আলতাব হোসেন নিয়মিত অফিস করছেন। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। এই গ্রেফতারি পরোয়ানার কপি আলতাব হোসেনের কর্মস্থল পাবনার পুলিশ সুপার বরাবর এবং গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরেও পাঠানো হয়। আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানাটি গত ১৪ মে তারিখে পাবনার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে রিসিভ করা হয়েছে। অথচ তিনি এখনো পাবনায় কর্মস্থলে নিয়মিতই অফিস করছেন।

মামলা, সম্পত্তি ক্রোক এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও সরকারি পরিচালক আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, জানতে চাওয়া হয়েছিল বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের কাছে। তিনি ফোন রিসিভ না করায় ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়। তবে তিনি এরও কোনো জবাব দেননি।

  • Related Posts

    ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল সম্পদের অভিযোগ, নিয়োগ অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল স্থাবর সম্পদ, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ও…

    ধর্ষণ থেকে কোটি টাকার সম্পদ—গণপূর্তের প্রকৌশলী তামজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কোথায়

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ দুর্নীতি, ঘুষ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগে প্রায় এক বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    দুদকের মামলা, অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা—তারপরও পাবনায় নিয়মিত অফিস করছেন আলতাব হোসেন

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 18 views
    দুদকের মামলা, অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা—তারপরও পাবনায় নিয়মিত অফিস করছেন আলতাব হোসেন

    ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল সম্পদের অভিযোগ, নিয়োগ অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 38 views
    ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল সম্পদের অভিযোগ, নিয়োগ অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন

    বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 5 views
    বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

    জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন প্রথম দিনে ১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ

    জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন প্রথম দিনে ১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ

    শেয়ারবাজার কারসাজি : সাকিবসহ ১৫ জনের তদন্ত প্রতিবেদন ১৭ নভেম্বর

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    শেয়ারবাজার কারসাজি : সাকিবসহ ১৫ জনের তদন্ত প্রতিবেদন ১৭ নভেম্বর

    তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যয়

    তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যয়