গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নে ‘লটারি প্রহসনের’ অভিযোগ: আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের দাবি ঘিরে তোলপাড়

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাসিক সর্বসাকুল্যে বেতন পান মাত্র ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু তাঁর জীবনযাপন রাজকীয় এবং বসবাস আলিশান অট্টালিকায়। দিনাজপুরের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি উঠে এসেছে অঢেল সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সরকারি চাকরি করলেও তাঁর গতিবিধি এবং কাজকর্ম রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের মতো। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেট।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য মিলেছে। মো. শাহনুর রশিদ বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে একের পর এক দুর্নীতির বিস্তার ঘটান। তবে পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি বিএনপি সমর্থক সেজে নিজের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা করছেন। ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা নিজের ও স্ত্রীর নামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের আঁচ পেয়ে ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা তুলে তা আত্মীয়দের কাছে সরিয়ে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সরকারি পদে থেকে নানা অনৈতিক উপায়ে সুবিধা আদায় করাই যেন তাঁর মূল কাজে পরিণত হয়েছিল। দিনাজপুরের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের কাজ করানো এবং নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করতেন, যাতে পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ অংশ নিতে না পারে। এ থেকে প্রতিটি কার্যাদেশের বিপরীতে বড় অঙ্কের কমিশন তিনি নিজের পকেটে পুরতেন।

দিনাজপুরের পুলহাট থেকে খানপুর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনা থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। মূলত এসব অনৈতিক সুবিধা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন অবৈধ সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য। পরবর্তীতে উপসহকারী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর দুর্নীতির মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের স্থাবর সম্পদের তালিকায় রয়েছে একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট। ২০১০ সালের ২৪ আগস্ট তিনি বিরামপুরে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের দুটি দোকান ও গোডাউন ক্রয় করেন, যার দলিল নম্বর ৪৫৯০। একই বছর ১০ অক্টোবর বিরামপুর মৌজায় ৩ শতাংশের একটি প্লট ক্রয় করেন, যার দলিল নম্বর ৩১৪৩। ২০১১ সালের ২২ জুন বাঁশবাড়িয়া মৌজায় ৫১.৫ শতাংশ জমি কেনেন, যার দলিল নম্বর ২৮৮৫।

সম্পদ অর্জনের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট বিরামপুর মৌজায় ৪০৮৩ নম্বর দলিলে ৭.৫ শতাংশ জমি কেনেন শাহনুর রশিদ। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাঁশবাড়িয়া মৌজায় ৫০৯৯ নম্বর দলিলে কেনেন আরও ৩৩ শতাংশ জমি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি রংপুরের সাতগাড়া মৌজায় ১২৭৫/১৮ নম্বর দলিলে ৪.০৮ শতাংশ জমি এবং ২০২০ সালে একই মৌজায় ৮৩৮৮ নম্বর দলিলে ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় আরও একটি প্লট ক্রয় করেন।

তাঁর অর্জিত অন্যান্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ৮৭৪ নম্বর দলিলে ২৫ লাখ টাকায় কেনা বিরামপুর মৌজার ১১.৫ শতাংশ জমি। এ ছাড়া বিরামপুরের কানিকাঠাল মৌজায় ৩১৭৬ ও ৩১৭৭ নম্বর দলিলে যথাক্রমে ৯৭.৫ শতাংশ এবং ৯১.৭৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়ায় ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর পল্লবীর বাউনিয়ায় ৯৮৭৫ নম্বর দলিলে কেনেন আরও একটি ফ্ল্যাট।

সরকারি চাকরি, কৃষি ও দোকানভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে তিনি তাঁর আয়কর নথিতে উল্লেখ করেছেন। তবে স্বল্প আয়ের চাকরিতে থেকে এত কম সময়ে কীভাবে এই সম্পদের মালিক হলেন, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। দুদকের দিনাজপুর জেলা কার্যালয় থেকে নথিপত্র সরবরাহের নোটিশ পাঠানো হলেও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া থামানোর জন্য রাজনৈতিকভাবে নানা তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

  • Related Posts

    ঢাকা বন বিভাগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ, ডিএফও বশিরুলকে ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদক: ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণ, অবৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট তৈরি এবং এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে,…

    রেলের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ, আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীনকে ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচন, কেনাকাটা এবং সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে : ভারতীয় হাইকমিশনার

    বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে : ভারতীয় হাইকমিশনার

    ঢাকা বন বিভাগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ, ডিএফও বশিরুলকে ঘিরে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২০, ২০২৬
    • 26 views
    ঢাকা বন বিভাগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ, ডিএফও বশিরুলকে ঘিরে প্রশ্ন

    ৩৯ হাজার আখচাষিকে প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    ৩৯ হাজার আখচাষিকে প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে : ভারতীয় হাইকমিশনার

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২০, ২০২৬
    • 7 views
    বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে : ভারতীয় হাইকমিশনার

    প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে উপহার পেয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস

    প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে উপহার পেয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস

    পে স্কেল নিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২০, ২০২৬
    • 7 views
    পে স্কেল নিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের