গণপূর্তে ‘কাগুজে উন্নয়ন’ কেলেঙ্কারি: কাজ নেই, তবু কোটি টাকার বিল—অভিযোগে তোলপাড়

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার গণপূর্ত বিভাগ-৩, যেটি মূলত সরকারি ভবন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর, সেটিকেই ঘিরে এখন ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে বাস্তবে কোনো কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই সিন্ডিকেটে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক, নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার ইবনে সাঈখ এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের নাম বারবার উঠে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে কায়সার ইবনে সাঈখ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে অসম্পূর্ণ কিংবা একেবারেই না হওয়া কাজের বিপরীতে ৪ কোটির বেশি টাকার বিল অনুমোদন দেন। এই অর্থ আবার বৃহৎ একটি বিতর্কিত ব্যয়ের অংশ, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা তড়িঘড়ি করে খরচ দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই—ফলে বড় প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আসলে কোথায় গেল।

একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে বিভিন্ন সংস্কার প্রকল্পেও। তেজগাঁও ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসের বাংলো-১ এবং সেন্ট্রাল রেকর্ড ভবনের জন্য প্রায় ১৯.৮৭ লাখ টাকার সংস্কার কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়, কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো কাজই করা হয়নি। সেগুনবাগিচার এনবিআর ভবন এবং অডিট কমপ্লেক্সেও মেরামত ও রংকরণের অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে দেয়াল ভাঙা, ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় পড়ে আছে। এতে সন্দেহ জোরালো হয়েছে যে এসব প্রকল্প আসলে পরিকল্পিতভাবে টাকা লুটের জন্যই করা হয়েছে।

ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও বেশ গুরুতর। অভিযোগ অনুযায়ী, সতীনাথ বসাক এবং কায়সার ইবনে সাঈখ মিলে অন্তত ৫ শতাংশ কমিশন আদায় করতেন। এই কমিশনের বিনিময়ে তারা অসম্পূর্ণ কাজের বিল পাস করতেন কিংবা কাজ না করেই টাকা তোলার সুযোগ করে দিতেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল এক ধরনের সাজানো লেনদেন।

অন্যদিকে, সরকারি ভবনগুলো যখন অবহেলায় জরাজীর্ণ, তখন নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজের অফিসে ২১ লাখ টাকা খরচ করে বিলাসবহুল সংস্কারের অভিযোগ উঠেছে। বারবার টাইলস ও মার্বেল পরিবর্তন, এমনকি মাত্র ১০ মাস আগে বসানো টয়লেট ফিটিংসও আবার বদলানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি সত্যিই প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি টাকা আত্মসাতের কৌশল?

সরকারি ক্রয় বিধিমালাও নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার হওয়ার কথা থাকলেও তা পাশ কাটিয়ে ম্যানুয়ালি নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে কায়সার ইবনে সাঈখের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সেখানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পে ৩ কোটি টাকার বিল ছাড়াতে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে তিনটি মডেল মসজিদ প্রকল্পে প্রায় ১.২ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। এসব প্রকল্পের কাজের মানও ছিল খুবই খারাপ—টাইলস খসে পড়া, পাইপে লিক, লিফট বিকল এবং অপারেশন থিয়েটারের এসি পর্যন্ত অচল হয়ে পড়ার মতো ঘটনা সামনে এসেছে, যা সরাসরি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এই পুরো সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ফিরোজ আহমেদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, তিনি সাইট ভিজিট রিপোর্টে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, কাজের পরিমাপে কারচুপি করেছেন এবং অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল পাশ করাতে সহায়তা করেছেন।

সবচেয়ে বিতর্কিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায়ে বাতিল হওয়া তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ৬০ কাঠার একটি প্লট ২০২৩ সালে পুনরায় হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়, যেখানে কায়সার ইবনে সাঈখের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে একাধিক মামলা চলমান।

এর আগে ২০১৯ সালে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এসব অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো শাস্তি হয়নি, বরং অভিযুক্তদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভালো পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রমাণ থাকার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কোথায় গিয়ে থেমে আছে, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ কে আটকে দিয়েছে, আর এই সিন্ডিকেটের পেছনে কারা রয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এখন এমন একটি দপ্তরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে, যেখানে প্রকল্প কাগজে আছে, বিলও আছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সচেতন মহল নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত, জবাবদিহিতা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।

  • Related Posts

    ফেসবুক পোস্ট থেকে পদোন্নতি—বিসিকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

    এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক…

    পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম অবহেলা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রামপুরার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা আর শৃঙ্খলার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে এলো চরম অবহেলার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন নিভে গেল এক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের প্রদীপ। ঢাকার…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 7 views
    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 7 views
    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 9 views
    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 9 views
    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 6 views
    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 4 views
    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী