বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং বিভাগ যেন এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. সাইদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম, প্রকল্প লুটপাট, বদলি-বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে বিতর্কিত এই কর্মকর্তা আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন ভয়াবহ সব অভিযোগে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন সাইদুর রহমান। ক্ষমতার পালাবদল হলেও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন তিনি। বরং আগের মতোই কূটকৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রেখে ড্রেজিং বিভাগকে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত আখের গোছাতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পে নদী খননের নামে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ভোগাই ও কংস নদ খননের কাজেও ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং কাগুজে খননের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প এলাকায় বাস্তবে কাজ না করেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়—এমন বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অভিযোগ আরও ভয়ংকর। বলা হচ্ছে, সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে ড্রেজিং বিভাগে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে দরপত্র বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কথা বললেই তাকে হয়রানি, বদলি কিংবা পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানায়, নদী খননের নামে প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কাগজে-কলমে শতভাগ বাস্তবায়নের রিপোর্ট তৈরি করা হতো। এরপর ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তুলে ভাগ-বাটোয়ারা করতেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব অপকর্মের মূল সমন্বয়ক ছিলেন সাইদুর রহমান নিজেই।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে তা বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী জমা পড়ার পরও তিন বছরেও যাচাই শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহল এবং কিছু অসাধু দুদক কর্মকর্তার সহায়তায় মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। জানা গেছে, এলজিইডি থেকে চাকরি বরখাস্ত হওয়ার তথ্য গোপন করে ২০০৩ সালে বিআইডব্লিউটিএতে যোগ দেন তিনি। অথচ সেই অভিযোগ তদন্তের বদলে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা হয়েছে তাঁকে।
বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “ড্রেজিং বিভাগ এখন সাইদুর রহমানের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে নিয়ম নয়, চলে সিন্ডিকেটের নির্দেশ।” তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই পদে থেকে সরকারি চাকরি বিধিমালারও চরম লঙ্ঘন করেছেন তিনি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি বহাল থেকে আগের মতোই প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সচেতন মহল বলছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের দুর্নীতি এখন শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয়; এটি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।










