চট্টগ্রাম বন বিভাগে দুর্নীতির ছড়াছড়ি, বনভূমি দখল আর কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তারা বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বছরের পর বছর এসব অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্ত অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে বন বিভাগের ভেতরে ক্ষোভ ও অস্থিরতা বাড়ছে।

সাবেক বন সংরক্ষক (সিএফ) বিপুল কুমার দাশের সময় থেকেই নানা অনিয়ম নিয়ে আলোচনা ছিল। পরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্ল্যা রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাদেকুর রহমানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের দায়িত্বে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ইচ্ছামতো রেঞ্জ পরিচালনা করছেন এবং বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও অনিয়মের ঘটনায় কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

সম্প্রতি কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ অফিস থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে দ্রুত ১৪টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের আলোতেই গর্জন গাছ কেটে পাহাড়ি বনভূমি দখল করা হলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা রহস্যজনকভাবে নীরব ছিলেন। ঘটনাস্থলের খুব কাছেই রেঞ্জ অফিস থাকলেও দখল ঠেকাতে কোনো অভিযান চালানো হয়নি। এমনকি ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা বা বিট কর্মকর্তাদের এলাকাতেও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ একটি চক্র কয়েকদিন ধরেই বনভূমি দখলের কাজ চালায়। বন বিভাগের সামনেই গাছ কেটে ঘর নির্মাণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকের ধারণা, বন কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন ছাড়া এত বড় দখল সম্ভব নয়। পরিবেশবাদীরাও আশঙ্কা করছেন, দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান না চালালে সংরক্ষিত বনভূমি স্থায়ীভাবে দখল হয়ে যেতে পারে।

এদিকে “সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা)” প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের একটি চক্রের বিরুদ্ধে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী বাগান তৈরি না করেই প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের ভেতরে আলোচনায় থাকলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান তদন্ত হয়নি। বরং প্রধান অভিযুক্তদের একজন সাদেকুর রহমানকে শাস্তি না দিয়ে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কুমিরা রেঞ্জে দ্রুত বর্ধনশীল বাগান তৈরির নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো হয়নি। পরিদর্শনে দেখা যায়, ১৭০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারাগাছের হার ছিল মাত্র ৬০ শতাংশের কিছু বেশি, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী অন্তত ৮০ শতাংশ থাকার কথা। আরেকটি ১০ হেক্টরের বাগানে চারার হার পাওয়া যায় প্রায় ৫০ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয় যে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের গাফিলতি ও অর্থ লোপাট হয়েছে।

এ ঘটনায় উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চট্টগ্রাম বিভাগের বন কর্মকর্তাদের কাছে দায়ীদের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠালেও অভিযোগ রয়েছে, সেই তালিকা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়। বন বিভাগের ভেতরে আলোচনা রয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বাঁচাতে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমনও অভিযোগ আছে যে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে প্রভাবিত করতে ঘুষ লেনদেন হয়েছে।

দুর্নীতির ঘটনায় যাদের নাম সামনে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, উপবন সংরক্ষক (ডিসিএফ) এস.এম. কায়চার এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জয়নাল আবেদীন। অভিযোগ রয়েছে, বনায়নের নামে বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়ার পর তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এস.এম. কায়চার বর্তমানে চট্টগ্রামে, সাদেকুর রহমান কক্সবাজারে এবং জয়নাল আবেদীন সিলেটের হবিগঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাদেকুর রহমান দায় এড়িয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে এস.এম. কায়চারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। আর জয়নাল আবেদীন বলেন, তিনি অভিযুক্ত হওয়ায় এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না।

সব মিলিয়ে বন বিভাগের ভেতরে দুর্নীতি, বনভূমি দখল, প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের সংরক্ষিত বনভূমি আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে।

  • Related Posts

    কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়ক উঁচু করায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, ড্রেন নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসীর আবেদন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়কটি নতুন করে সংস্কার ও উঁচু করে নির্মাণ করা হলেও এতে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করা এই…

    আদালতের স্থিতাবস্থা উপেক্ষা করে জমি দখলের অভিযোগ, গৃহায়নের কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমানকে ঘিরে ক্ষোভ

    এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর রূপনগর এলাকার দুয়ারীপাড়া মৌজায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও আদালতের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) অমান্যের অভিযোগে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মাহমুদুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    শিক্ষার মান সম্পর্কে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্পষ্ট ধারণা নেই: শিক্ষামন্ত্রী

    শিক্ষার মান সম্পর্কে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্পষ্ট ধারণা নেই: শিক্ষামন্ত্রী

    হাম ও উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু

    হাম ও উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু

    চট্টগ্রাম বন বিভাগে দুর্নীতির ছড়াছড়ি, বনভূমি দখল আর কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

    চট্টগ্রাম বন বিভাগে দুর্নীতির ছড়াছড়ি, বনভূমি দখল আর কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

    কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়ক উঁচু করায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, ড্রেন নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসীর আবেদন

    কাপাসিয়া-চাঁদপুর সড়ক উঁচু করায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, ড্রেন নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসীর আবেদন

    হরমুজ পাড়ি দিতে ইরানের ‘নতুন নিয়ম’, অনুমতি ছাড়া চলবে না কোনো জাহাজ

    হরমুজ পাড়ি দিতে ইরানের ‘নতুন নিয়ম’, অনুমতি ছাড়া চলবে না কোনো জাহাজ

    ১৩ রানের জন্য বিশ্ব রেকর্ড হাতছাড়া করলেন শান্ত

    ১৩ রানের জন্য বিশ্ব রেকর্ড হাতছাড়া করলেন শান্ত