এসএম বদরুল আলমঃ রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর অন্যতম জাতীয় সংসদ ভবন। সেই সংসদ ভবনের আওতাধীন একটি স্টোররুমকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সরকারি নথিতে সংরক্ষিত থাকার কথা বলা বিপুল পরিমাণ কপার বাসবারের হিসাব মিলছে না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন, মালামাল সংরক্ষণ, সার্ভে রিপোর্ট এবং দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসায় পুরো বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আমব্রেলা প্রকল্পের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলার চারটি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের উন্নয়নকাজে পুরোনো ট্রান্সফরমার, এইচটি ও এলটি প্যানেল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কপার বাসবার অপসারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মোট ১৪০৯টি কপার বাসবার পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে ৬৬টি পুনর্ব্যবহার করা হয় এবং অবশিষ্ট ১৩৪৩টি স্টোরে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে স্টোর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উল্লিখিত সংখ্যক কপার বাসবারের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েকটি কপার বার উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জাতীয় সংসদ ভবনের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ ভারী ধাতব মালামাল কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল?
নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, একই প্রকল্পের জন্য একাধিক সার্ভে রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে স্বাক্ষরের ঘাটতি রয়েছে, কোথাও তারিখ নেই, আবার কোথাও মালামালের পরিমাণ ও মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে। এসব অসঙ্গতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান। নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং উপসহকারী প্রকৌশলীর মধ্যে কেউই সরাসরি দায় স্বীকার করছেন না। বরং একে অপরের দিকে দায় নির্দেশ করার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী দাবি করেছেন, তাকে কখনোই স্টোরের প্রকৃত অবস্থা বা মালামালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, প্রকল্পের অনেক বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও নতুন প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রকল্পের কাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও তাদের বিলের একটি অংশ আটকে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
ঘটনার পর গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে স্টোর ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখনো পুরো ঘটনার চূড়ান্ত দায় কার ওপর বর্তাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রকাশিত সংবাদকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘অসত্য’ দাবি করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবাদে উল্লেখিত কপার বাসবারের সংখ্যা ও মূল্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যদি মালামাল স্টোরে সংরক্ষিত ছিল, তাহলে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোথায়? যদি চুরি হয়ে থাকে, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক কোথায়? আর যদি নথিপত্রে অসঙ্গতি থেকে থাকে, তাহলে প্রকল্পের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর ছিল?
জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারি সম্পদের হিসাব নিয়ে তৈরি হওয়া এই ধোঁয়াশা কেবল একটি স্টোররুমের ঘটনা নয়; এটি সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট সকল নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কপার বাসবারের এই রহস্যের সমাধান মিলবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।











