এসএম বদরুল আলমঃ নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), যার ওপর দেশের নদীপথ, বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার বিশাল দায়িত্ব ন্যস্ত। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিকেই ঘিরে উঠেছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। সাম্প্রতিক একাধিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—সংস্থাটির ভেতরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী একটি চক্র, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিজাম উদ্দিন পাঠান নামের এক কর্মকর্তা। এক সময়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হলেও বর্তমানে তিনি সংস্থার ভেতরে “অঘোষিত চেয়ারম্যান” কিংবা “গডফাদার” হিসেবেই বেশি পরিচিত।
জানা যায়, চাকরির শুরু থেকেই বড় বড় ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন নিজাম উদ্দিন পাঠান। সেই সম্পর্কই ধীরে ধীরে তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে পৌঁছে তিনি প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠতে থাকে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি। রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বনশ্রীর জে, এস ও সি ব্লকে একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়াও আশপাশে জমি ও বাড়ির মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হলেও সেখানকার স্থানীয়দের প্রতিও তিনি উদাসীন—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও গুঞ্জন।
বাঘাবাড়ি নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ জাফর নামের এক ঠিকাদারকে পুরো কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে-কলমে প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ি প্রকল্পেও মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও কাগজে সম্পূর্ণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপন অংশীদারিত্বে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতির টাকায় ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত হয়ে পড়েন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। “এস এস রহমান কোম্পানি”-র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এমন গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সচিবালয়ও নড়েচড়ে বসেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর ফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে বিল, ভাউচার ও পেমেন্টের নথিপত্রে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল তোলা এবং অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই সম্পন্ন দেখানোর প্রমাণ মিলছে বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, বিআইডব্লিউটিএ-তে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে মেধা নয়—প্রভাব ও রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান বিবেচ্য। নিয়োগে অনিয়ম, পারিবারিক প্রভাব, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের পুনঃনিয়োগসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “যে কর্মকর্তা ঠিকাদারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখে, সেই-ই টিকে থাকে।”
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পেও ভয়াবহ অনিয়ম রয়েছে। কাজ হয়েছে অর্ধেকেরও কম, অথচ কাগজে দেখানো হয়েছে সম্পূর্ণ। নিম্নমানের নির্মাণ, অসম্পূর্ণ অবকাঠামো এবং বাস্তবতার সঙ্গে কাগুজে উন্নয়নের বিশাল ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী ও খানপুর পোর্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ-র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের বক্তব্য—বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সংস্কার না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং, উন্মুক্ত অডিট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের নদীপথ অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত বিআইডব্লিউটিএ যদি দুর্নীতির এই চক্র থেকে মুক্ত না হয়, তবে উন্নয়ন পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার প্রশ্ন—নিজাম উদ্দিন পাঠানের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের হাত থেকে আদৌ কি মুক্তি পাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান?









