ফেসবুক পোস্ট থেকে পদোন্নতি—বিসিকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (মূল পদবী উপ-মহাব্যবস্থাপক) মোঃ রাশেদুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিসিকে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রাশেদুর রহমান দাবি করেছেন, বর্তমানে তিনি সরকারি চাকরিতে আছেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১১ সালের ৯ অক্টোবর নিয়োগাদেশ পেলেও ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর বিসিকে যোগদান করেন রাশেদুর রহমান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিশেষভাবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও নিয়মিতভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পোস্ট দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিসিকের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার পর রাশেদুর রহমান হয়ে ওঠেন অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর টেন্ডার কার্যক্রমে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেক ঠিকাদার ও অভ্যন্তরীণ সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তার পছন্দের বাইরে থাকা কোনো ঠিকাদার যাতে কাজ না পায়, সেজন্য নানামুখী কৌশল প্রয়োগ করা হতো। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রাশেদুর রহমান।

এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে পোস্ট দেন। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কপি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা পড়ে। তবে অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও তিনি প্রশাসনিক প্রভাব ও অর্থের জোরে দায় এড়িয়ে যান।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাকে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিসিক কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি কিংবা ফলাফল সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই রাশেদুর রহমানকে সহকারী মহাব্যবস্থাপক থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর বিসিকের মহাব্যবস্থাপকের শূন্য পদের বিপরীতে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বও দেওয়া হয়, যা নিয়ে বিস্ময় ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং অবৈধ আর্থিক সুবিধার একটি অংশ রাজনৈতিক বলয়ে ব্যয় করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিসিকের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোঃ রাশেদুর রহমান বলেন, তিনি বর্তমানে একজন সরকারি কর্মকর্তা, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্বীকার করেন তিনি।

বিসিকের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের পরও পদোন্নতির মতো ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয় কি না।

  • Related Posts

    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ইলিয়াস আহম্মেদ। সরকারি দায়িত্বে থেকেই ঘুষ, কমিশন, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি এমনই অভিযোগ…

    নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের অলংকার মোড় এলাকার সৌদিয়া ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন নকল ইনসুলিন বিতরণ চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ সময় মোজাম্মেল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে নকল নোভো নরডিস্ক ব্র্যান্ডের ইনসুলিন…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    অনভিবাসী ভিসাধারীদের উদ্দেশে নতুন সতর্কবার্তা মার্কিন দূতাবাসের

    • By admin admon
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 3 views
    অনভিবাসী ভিসাধারীদের উদ্দেশে নতুন সতর্কবার্তা মার্কিন দূতাবাসের

    এবার বাধ্যতামূলক হচ্ছে এনআইডি নবায়ন

    • By admin admon
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 4 views
    এবার বাধ্যতামূলক হচ্ছে এনআইডি নবায়ন

    হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬৮ হাজার ২৯৭ হাজি

    • By admin admon
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 4 views
    হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬৮ হাজার ২৯৭ হাজি

    দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

    • By admin admon
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 5 views
    দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে

    • By admin admon
    • জুন ২৭, ২০২৬
    • 8 views
    গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে

    নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক

    • By admin admon
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 9 views
    নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক