গণপূর্তে ক্ষমতার অপব্যবহার: নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম ভাঙা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সরকারি দপ্তরকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদের মতো ব্যবহার করে তিনি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতি তার এই অবহেলা দেখে অনেক সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

একসময় নিয়াজ মো. তানভীর আলম বঙ্গভবনে এসডিই হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আজিমপুর এলাকায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন। সেখান থেকে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে সচিবালয়ে বদলি করা হলেও তিনি নির্ধারিত নিয়ম মানেননি। অভিযোগ রয়েছে, বদলির পর এক মাসেরও বেশি সময় তিনি একসঙ্গে দুটি ডিভিশনের দায়িত্ব পালন করেন, যা স্পষ্টভাবে সরকারি আদেশের লঙ্ঘন। এমনকি দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ না করে ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল ছাড় করেন এবং এর মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যে জড়ান।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা মানেননি। বরং একই সময়ে দুই জায়গায় অফিস চালিয়েছেন, ব্যবহার করেছেন দুটি সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা। বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা ঘিরে সরকারি দপ্তরে প্রশ্ন উঠেছে—কোন শক্তির জোরে তিনি বারবার আইন ও নিয়ম ভেঙে পার পেয়ে যাচ্ছেন?

আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে নির্মাণাধীন বহুতল মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড নিয়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পে প্রায় ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ডিপিপিতে যেখানে ২৮৮টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, সেখানে অনুমোদন ছাড়াই তা কমিয়ে ২৪০টিতে নামিয়ে আনা হয়। এতে প্রায় ১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হলেও সেই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কাজের জন্য আলাদা আলাদা দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা টাকা ভাগাভাগি করার চেষ্টা করেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

এই অনিয়মের তদন্তে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস এবং সদস্য ছিলেন আশেক আহমেদ শিবলী। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা কমানো স্থপতির এখতিয়ার বহির্ভূত এবং এটি প্রকল্প পরিচালনা কমিটির অনুমোদন ছাড়া করা ঠিক হয়নি। তবুও এসব অনিয়মের পরও প্রকৌশলী তানভীর আলম কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

লিফট স্থাপনের টেন্ডারেও গুরুতর কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। মতিঝিল ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনের কাজ দেওয়া হয় রওশন এলিভেটরসকে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ২০ বছরের উৎপাদন অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সার্টিফিকেশন থাকার কথা ছিল। কিন্তু রওশন এলিভেটরসের ইতালীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মোভিলিফট’ এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তবুও যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের দরপত্রকে বৈধ ঘোষণা করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

এ ছাড়া আজিমপুর নতুন কলোনিতে রক্ষণাবেক্ষণের নামে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অথচ বেশিরভাগ ভবন নতুন হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজনই ছিল না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ভবনের নামে যে বৈদ্যুতিক কাজের বিল দেখানো হয়েছে, সেসব ভবনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি যেসব বাসার নামে বিল করা হয়েছে, সেই বাসার বাসিন্দারাও কোনো কাজ হওয়ার কথা জানেন না। এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই পুরো সময়ে আজিমপুর ইএম বিভাগ-৩-এর দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম। তার সঙ্গে ছিলেন এ কে এম গোলাম মোস্তফা। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই প্রভাবশালী প্রকৌশলী রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ের ব্যবস্থা করেছেন, যার বড় একটি অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি দুই জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এ বিষয়ে তার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 12 views
    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 13 views
    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 13 views
    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ