জহুরুল হক জনি, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ দেশজুড়ে কৃষকরা যখন ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করছেন নানান ধরনের সবজি, তখন বাজারে সেই সবজির দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু চরম বাস্তবতা হলো এর অধিকাংশ লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে, আর প্রথম স্রোতের নায়ক কৃষক রয়ে যাচ্ছেন প্রান্তে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন টনকে টন সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, টমেটো, মরিচ, মুলা, শিমসহ বিভিন্ন মৌসুমী সবজি স্থানীয় কৃষকরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে পরিবহন খরচ অন্যদিকে পর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব সব মিলিয়ে কৃষকরা সবজি তুলেই যেন লোকসানে পড়ছেন। একই সবজি মাঠ থেকে কৃষক বিক্রি করছেন ১০–১২টাকায়, যা ভোক্তার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৩০–৪০ টাকা।
এই ব্যবধান কোথায় যাচ্ছে…?
উত্তর একটাইঃ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
কীভাবে লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে.?
কৃষকদের কাছ থেকে পাইকাররা কম দামে সবজি কিনে নেন। এরপরে শহরের আড়তে গিয়ে তা বিক্রি হয় দ্বিগুণ বা তিগুণ দামে। এই চক্রে জড়িত থাকে: স্থানীয় দালাল,পরিবহন সিন্ডিকেট, আড়ৎদার ও শহরের খুচরা বিক্রেতারা। ফলে প্রকৃত উৎপাদক কৃষককে তার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
কৃষকের কণ্ঠে ক্ষোভ:
আদিতমারী উপজেলার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, দ্রুত পচনশীল হওয়ায় আমরা লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। অন্যদিকে হাতীবান্ধার কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি না থাকায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।
পাইকাররা কম দামে সবজি কিনে নেয়,
আর আড়তে বিক্রি করতে গেলে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ হওয়ায় কৃষকের লাভ আরও কমে যায়। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনতো, আমরা কিছুটা হলেও বাঁচতাম। দালালরা সব খেয়ে ফেলছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মত:
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরাসরি কৃষক-ভোক্তা সংযোগ তৈরি না হলে কৃষি ব্যবস্হাপনা কখনোই টেকসই হবে না।
⇨প্রান্তিক কৃষকদের সংগঠন গড়ে তুলে সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
⇨কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
করণীয় কী..?
⇨কৃষকের ন্যায্য দামের নিশ্চয়তায় সরকারিভাবে সরাসরি ক্রয় কেন্দ্র চালু করা।
⇨ডিজিটাল কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
⇨স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি অফিসের নজরদারি বাড়ানো
⇨কৃষকদের সংগঠিত করে পাইকারি বাজারে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে,
চলতি মৌসুমে জেলায় আলু বাদে প্রায় ৫ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ আবাদ আরও বাড়বে।
পাশাপাশি নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
উপসংহার:
“কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে”
এই কথা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের ভবিষ্যৎ দুটোই বিপন্ন হতে পারে।











