ঘুষ, ভুল রায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে এলজিইডিতে চাকরি স্থায়ীকরণের নামে কোটি টাকার লুট

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতির নামে ঘুষ লেনদেনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সরকারকে গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি। অভিযোগ উঠেছে, এসব অনিয়মের ফলে সরকারের প্রায় ছয় কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, অথচ যাদের প্রকৃতপক্ষে আদালতের বৈধ রায় রয়েছে তারা ঘুষ দিতে না পারায় চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সর্বশেষ আলোচনায় এসেছে এলজিইডির তথাকথিত “ওহাব গ্রুপ”। এই গ্রুপের ১২ জন কর্মচারীকে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতি দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যার তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২৫। জানা যায়, এই গ্রুপের মোট ২৪ জন ২০১১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিটের রায়ে আদালত তাদের এলজিইডির রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রিট দায়েরের সময়ই তারা রাজস্ব খাতের কর্মচারী ছিলেন। অর্থাৎ আদালতের রায়টি বাস্তব প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় ও বিভ্রান্তিকর ছিল।

হাইকোর্টের রায়ে কোথাও পদোন্নতি, গ্রেড পরিবর্তন বা কার্যকর তারিখ উল্লেখ ছিল না। শুধু বলা হয়েছিল, শূন্য স্থায়ী পদে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করতে। তবুও সেই রায়কে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যান ওহাব গ্রুপের সদস্যরা। গত প্রায় সাড়ে চব্বিশ বছরে এলজিইডিতে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৩ থেকে ১৪ জন প্রধান প্রকৌশলী। তাদের কেউই এই রায় বাস্তবায়নে সম্মতি দেননি, কারণ এটি নিয়োগ বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আব্দুর রশীদ মিয়াকে ম্যানেজ করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ফাইল নড়াচড়া শুরু করা হয়। প্রশাসন শাখার একাধিক কর্মকর্তা ও উচ্চমান সহকারীও মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন বলে অভিযোগ আছে। তবে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন) ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ভুল রায়ের ভিত্তিতে তারা কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করবেন না।

পরবর্তী সময়ে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনও একই অবস্থান নেন। তিনি বলেন, নিয়োগ বিধি অনুযায়ী সার্ভেয়ার ও কার্য সহকারী পদের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল ও বিভাগীয় পরীক্ষার শর্ত রয়েছে। অথচ ওহাব গ্রুপে কমিউনিটি অর্গানাইজার ও স্টোর কিপারের মতো পদও রয়েছে, যাদের পদোন্নতির জন্য নিয়োগ বিধি সংশোধন প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।

তবুও থেমে থাকেনি ওহাব গ্রুপ। রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় তারা আবার সক্রিয় হয়। অভিযোগ আছে, জাবেদ করিমকে প্রায় এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। তাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, ২০০৬ সাল থেকে চাকরি স্থায়ী দেখানো হলে প্রত্যেকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাবদ অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা পাবেন। এই আশায় তারা আরও টাকা তুলে ‘ফান্ড’ তৈরি করেন।

জাবেদ করিম প্রশাসন শাখার নতুন কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করালেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সমালোচনার মুখে পড়েন। এরপর তিনি আর স্থায়ীকরণের অফিস আদেশে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। কিন্তু বর্তমান রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার সময় প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা আবার সক্রিয় হন। অভিযোগ অনুযায়ী, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ১২ জনসহ মোট ১৪ জনের চাকরি স্থায়ীকরণের অফিস আদেশ জারি করা হয়।

এই অফিস আদেশে সুযোগ বুঝে আরও দু’জনের নাম যুক্ত করা হয়, যারা ওহাব গ্রুপের সদস্য নন। প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা ও এক উচ্চমান সহকারী ঘুষের বিনিময়ে এই কাজটি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, একই সময়ে এলজিইডিতে কর্মরত বুল বুল আহমদের ঘটনা এই বৈষম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার চাকরি স্থায়ীকরণের পক্ষে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, কনডেম অব কোর্ট, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, পিএসসি ও আইন মন্ত্রণালয়—সব জায়গা থেকেই নির্দেশ এসেছে। তবুও ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার চাকরি আজও স্থায়ী হয়নি।

অন্যদিকে, আবু ফাত্তাহ নামের একজন ব্যক্তি দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর নকল সনদের মাধ্যমে এলজিইডিতে কনসালটেন্ট হিসেবে মোটা বেতনে চাকরি করেছেন। তিনি নিজেকে স্নাতক পরিচয় দিলেও বাস্তবে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ ছাড়া আর কোনো ডিগ্রির প্রমাণ দেখাতে পারেননি। শিক্ষা সনদের কপি চাইলে তা দিতে ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট দপ্তর। অভিযোগ আছে, এলজিইডির মিডিয়া কনসালটেন্ট পরিচয় ব্যবহার করে তিনি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো, মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো এবং টাকা আদায়ের মতো কাজ করেছেন।

চাকরি না থাকলেও বিভিন্ন সুপারিশ ও চাপের মুখে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা তাকে আবার একটি বড় প্রকল্পে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেন। এতে এলজিইডির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এলজিইডিতে আইন, আদালতের রায় ও নিয়োগ বিধির চেয়ে ঘুষ ও তদবিরই বেশি কার্যকর।

  • Related Posts

    ফেসবুক পোস্ট থেকে পদোন্নতি—বিসিকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

    এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক…

    পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম অবহেলা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রামপুরার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা আর শৃঙ্খলার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে এলো চরম অবহেলার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন নিভে গেল এক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের প্রদীপ। ঢাকার…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 28 views
    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 23 views
    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 22 views
    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 21 views
    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 18 views
    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 14 views
    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী