দুদকের মামলা হলেও বহাল নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া, প্রশ্নে এলজিইডির নীরবতা

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া এখনও নিজ পদে বহাল রয়েছেন। রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের ৪র্থ ও ৫ম তলার নির্মাণ কাজ না করেই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

দুদকের মামলার এজাহার অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া তার সহযোগী সিনিয়র প্রকৌশলী ছাবের আলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শামস জাভেদ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলীর মালিক আবু সাইদ খানের সঙ্গে যোগসাজশে এই অনিয়ম করেন। অভিযোগে বলা হয়, ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৬ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় বাদী হয়ে ২৮ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর ৩৬ হলেও অভিযুক্তরা এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

এলজিইডি ঢাকা জেলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাচ্চু মিয়ার প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। তিনি আরও বলেন, মামলার পর বাচ্চু মিয়া কিছুদিন অফিসে অনুপস্থিত থাকলেও বর্তমানে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে উপস্থিত থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দুদকের মামলার পর থেকে তারা কোনো অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। অফিসে প্রায়ই রূঢ় আচরণ করেন এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

এছাড়া বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও বড় অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুইয়ার নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, প্রকল্প পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে নিয়মিতভাবে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, গত জুন মাসে কাজ শেষ না করেই বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অগ্রিম বিল ছাড় করেছেন। দৃষ্টিনন্দন স্কুল প্রকল্পে প্রায় ৩০ কোটি টাকা, কেরানীগঞ্জ প্রকল্পে তিনটি প্যাকেজে ৩০ কোটি টাকা এবং বান্দুরা ব্রিজ প্রকল্পে প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়, যেখানে কাজের অগ্রগতি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল মেইনটেনেন্স খাতে কাজ না করেই প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশিরভাগ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। একই রাস্তার ছবি বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। এলজিইডির মেইনটেনেন্স ইউনিটের ডাটাবেজ পরীক্ষা করলেই এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো নিজের পরিবারের নামে কাজ বাগিয়ে নেওয়া। বাচ্চু মিয়া তার ভাই শহিদুল ইসলাম (সুমন)-এর নামে দুটি তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়েছেন, যা নিয়মবহির্ভূত। একটি লাইসেন্স মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ এবং অন্যটি মোহনা এন্টারপ্রাইজ নামে নিবন্ধিত। এই লাইসেন্স ব্যবহার করে বিনা দরপত্রে অফিস ভবন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেওয়া হয় এবং কাজ না করেই প্রায় ৪৮.৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া তার মেয়ের নামে থাকা লাইসেন্সে আরও প্রায় ৩.৯৮ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়েছে।

অফিস সূত্রে জানা যায়, বাচ্চু মিয়া দিনের বেলায় দাপ্তরিক কাজের পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সময় কাটান। সন্ধ্যার পর বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের নিয়ে অফিসে বসে সিদ্ধান্ত নেন। অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার যাতায়াতের সময় ও কর্মকাণ্ড স্পষ্ট হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কর্মস্থলে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও কম নয়। নিয়মিত কর্মচারীদের বাদ দিয়ে নিজের নিয়োগ করা বহিরাগত লোক দিয়ে অফিস চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আনিস নামের এক বহিরাগত ব্যক্তিকে তিনি তার প্রধান সহকারী হিসেবে ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বাধ্য হয়ে ঢাকা জেলা এলজিইডি অফিস ছেড়ে অন্যত্র বদলি নিয়েছেন।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 8 views
    বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার

    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি

    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 6 views
    ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মিলছে না: আইএইএ

    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 13 views
    স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৪

    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 12 views
    পাঁচ গ্রামে বাঘের পায়ের ছাপ, ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি, আতঙ্ক

    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ

    • By Sara
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 8 views
    সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ