স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে গণপূর্তে তোলপাড়: দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ও মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি অর্থ নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে নতুন করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে উঠে এসেছে শেরে বাংলা নগর বিভাগ–২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার (উন্নয়ন ও সমন্বয়) এ.এস.এম. সানাউল্লাহর নাম। পৃথক দুটি ঘটনায় সরকারি অর্থের অপব্যবহার, নিয়ম ভঙ্গ করে ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং কাজ শেষ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ সামনে এসেছে।

সূত্র জানায়, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন কয়েকটি হাসপাতালের মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের টয়লেট, ফ্লোর টাইলস, রং, ড্রেন, করিডোর আধুনিকায়ন ও বাহ্যিক সংস্কারের কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কাজ শেষ না করেই পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম অর্থবছরের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে প্রাক্কলন অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। সময় স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই না করে কাগজে–কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়। কাজ শেষ করার শেষ সময়সীমা ছিল ২৬ জুন ২০২৫, অথচ ওই সময়ের মধ্যেই কাজ অসম্পন্ন থাকা অবস্থায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসব প্রকল্পে এলটিএম (Limited Tendering Method) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে মাত্র একজন বা দুজন ঠিকাদার অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদাররা প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। পিপিআর অনুযায়ী দরপত্রে প্রতিযোগিতা না থাকলে তা বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করার কথা থাকলেও সেই নিয়ম মানা হয়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এ.এস.এম. সানাউল্লাহর বিরুদ্ধেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার (উন্নয়ন ও সমন্বয়) এ কর্মরত আছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন মাত্র ছয় মাসে বহু দরপত্রে নিয়ম পরিবর্তন করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়েছেন। এলটিএম হওয়ার কথা থাকলেও তা ওটিএম পদ্ধতিতে রূপান্তর করে কোটি টাকার কাজ বণ্টন করা হয়। কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। পরবর্তীতে তার দ্বায়িত্ব হস্তান্তর হয় জহুরুল ইসলাম এর কাছে। কিন্তু তারা দুজনই তাদের দ্বায়িত্বের আড়ালে দুর্নীতিতে লিপ্ত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ.এস.এম. সানাউল্লাহ একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি বলয় তৈরি করেন, যেখানে কাজ পাওয়ার বিনিময়ে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। জুন মাসে অনুমোদিত কয়েকটি কাজ এখনো অসম্পন্ন হলেও নিয়ম ভেঙে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, কারণ তারা ওই বলয়ের বাইরে ছিলেন।

আরও অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই কর্মকর্তা নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে তথ্য পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও আলোচনায় এসেছে, যদিও এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট তদন্তের ফল এখনও প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জহুরুল ইসলাম ও এ.এস.এম. সানাউল্লাহ উভয়েই অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেছেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিল দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাস্তব কাজ ও কাগজের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।

সচেতন মহল মনে করছে, স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক খাতে এ ধরনের অনিয়ম জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।

  • Related Posts

    ট্রাইব্যুনালে মামলা বিচারাধীন, নথিতে তদন্তের তথ্যও আছে—তবু গণপূর্ত ই/এমের তিন প্রকৌশলীকে উচ্চতর পদে নেওয়ার তৎপরতা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে একই বিষয়ে মামলা বিচারাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মামলার নথিতে পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব প্রদানের আইনগত কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর মধ্যেই…

    বাঁধ মেরামতের টাকায় ম্যুরাল নির্মাণের অভিযোগ, পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী প্রবীরকে ফের আইনি নোটিশ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে বাঁধ মেরামতের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কাজে ব্যয় করার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    শিল্পকলায় ‘রাইজ অ্যান্ড শাইন’

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 10 views
    শিল্পকলায় ‘রাইজ অ্যান্ড শাইন’

    জিসাসের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 7 views
    জিসাসের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

    রোনালদোকে দেওয়া কথা রাখেননি জেসুস, পর্তুগাল শিবিরে অস্বস্তি

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 6 views
    রোনালদোকে দেওয়া কথা রাখেননি জেসুস, পর্তুগাল শিবিরে অস্বস্তি

    জিদানের সাবেক ক্লাব মাত্র ১ ইউরোতে বিক্রি

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 7 views
    জিদানের সাবেক ক্লাব মাত্র ১ ইউরোতে বিক্রি

    মেসির ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে এখনই ভাবছেন না স্কালোনি

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 10 views
    মেসির ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে এখনই ভাবছেন না স্কালোনি

    অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশ নারী দল ঘোষণা

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
    • 11 views
    অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশ নারী দল ঘোষণা