ঘুষ-দালালের জালে উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: দুদকের অভিযানেও থামেনি অনিয়ম

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ এখন আর নতুন নয়। স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত, যেন প্রকাশ্য গোপন কথা। ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়া, দালাল ছাড়া ফাইল নড়াচড়া না করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি—সব মিলিয়ে অফিসটি এখন অনিয়মের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সেবা নিতে আসা মানুষদের অভিযোগ, অফিসটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি প্রবেশ কার্যত কঠিন করে রাখা হয়েছে। অফিসের সামনে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দালালের মাধ্যম ছাড়া ভেতরে ঢোকাই মুশকিল। ফলে সেবাপ্রার্থীরা বাধ্য হচ্ছেন দালালনির্ভর ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে।

উখিয়া সদর এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব ফি পরিশোধ করার পরও তাকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে। একপর্যায়ে তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়—কিছু টাকা ‘ম্যানেজ’ না করলে দলিল নামানো সম্ভব নয়। এমন অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয়, বহু মানুষের একই অভিযোগ।

স্থানীয় দলিল লেখক ও একাধিক সূত্রের মতে, অফিস সহকারী বেবী রাণী দে এই অনিয়মের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন। তার সঙ্গে মোহরার সৃদুল দাশ এবং কর্মচারী রবিউল্লাহ রবির নামও বারবার উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই তিনজনকে ঘিরেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অফিসের ভেতরের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

জমি নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি’র বাইরে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগও গুরুতর। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জমির ঘোষিত মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। অর্থাৎ এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে দিতে হয় প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা অতিরিক্ত। এই টাকা সরাসরি হাতে নেওয়া হয় না; দলিল লেখকদের মাধ্যমে আদায় করা হয়, যাতে লেনদেন আড়ালে থাকে।

গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবা দিতে গড়িমসি এবং অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

অফিসের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুদকের অভিযানের খবর আগেই সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম জেনে যান। সেদিন তিনি অস্বাভাবিকভাবে সকালে অফিসে উপস্থিত হন এবং অফিসে থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।

দুদকের জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলসান আনোয়ার অভিযানের দিন জানান, ছদ্মবেশে গিয়ে দলিল নিবন্ধনের খরচ, পদ্ধতি এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হয়রানি ও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।

তবে এত কিছুর পরও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এই অভিযান কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল?

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলমকে ঘিরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পতিত সরকার আমল থেকেই তিনি একই অফিসে বহাল রয়েছেন। একাধিকবার অভিযোগ ওঠার পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—যদি অফিসে অনিয়ম না থাকে, তাহলে বারবার এত অভিযোগ আসে কেন? আর অভিযোগ মিথ্যা হলে দুদক কেন অভিযান চালাল?

একজন প্রবীণ দলিল লেখকের ভাষায়, দীর্ঘদিন একই কর্মকর্তা এক জায়গায় থাকলে সেখানে সিন্ডিকেট তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই অনিয়ম একদিনে হয়নি, এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে।

ঘুষ আদায়ের পাশাপাশি আরও ভয়াবহ অভিযোগও রয়েছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন, প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন এবং এর মাধ্যমে সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব কাজে অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্পৃক্ততার কথাও বলছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, সরকার বদলালেও মাঠপর্যায়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনই যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।

অভিযুক্ত অফিস সহকারী বেবী রাণী দে ও মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রবিউল্লাহ রবি জানান, তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অফিসে প্রবেশে কোনো বাধা নেই এবং সব কার্যক্রম সিসিটিভির আওতায়। তার দাবি, অবৈধ লেনদেনের সুযোগ নেই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয়দের দাবি পরিষ্কার—শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন প্রশাসনিক জবাবদিহি। তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চান।

  • Related Posts

    পদোন্নতি থেকে নিয়োগ—এলজিইডির প্রশাসনে ‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ, আলোচনায় শফিকুর রহমান

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অর্থ লেনদেন এবং প্রভাব…

    অভয়নগরে তিন সন্ত্রাসী আটক, অস্ত্র-গুলিসহ মোটরসাইকেল জব্দ

    যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাগমারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত তিন সন্ত্রাসীকে আটক করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি দেশে তৈরি ওয়ান শুটারগান, দুই রাউন্ড তাজা গুলি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    হরমুজে জাহাজ চলাচলে ফি আরোপের খসড়া অনুমোদন ইরানের

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 5 views
    হরমুজে জাহাজ চলাচলে ফি আরোপের খসড়া অনুমোদন ইরানের

    ইরান যুদ্ধে খুব শিগগিরই ‘নতুন ধাপে’ প্রবেশ করবে যুক্তরাষ্ট্র

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 7 views
    ইরান যুদ্ধে খুব শিগগিরই ‘নতুন ধাপে’ প্রবেশ করবে যুক্তরাষ্ট্র

    মুন্সীগঞ্জে ২ লাখ বর্গমিটার কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ধ্বংস

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    মুন্সীগঞ্জে ২ লাখ বর্গমিটার কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ধ্বংস

    ঢাকার দুই স্টেডিয়াম পরিদর্শনে ব্রাজিল ফুটবলের প্রতিনিধি দল

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 7 views
    ঢাকার দুই স্টেডিয়াম পরিদর্শনে ব্রাজিল ফুটবলের প্রতিনিধি দল

    বড় সুখবর পেল বাংলাদেশ

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 6 views
    বড় সুখবর পেল বাংলাদেশ

    ২৫ বছরের তরুণের চরিত্রে ফিরছেন ৬১ বছরের আমির খান

    • By Sara
    • আগস্ট ২৩, ২০২৬
    • 6 views
    ২৫ বছরের তরুণের চরিত্রে ফিরছেন ৬১ বছরের আমির খান