ভূমিকম্প ছাড়াই ধসে পড়ার ঝুকিতে নোয়াখালী জেলা কারাগার- ৮ বছর কেটে গেলেও এখনো ডিজাইন ই ফাইনাল হয়নি। সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিবের হস্তক্ষেপের পরেও নেয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষ কি শত শত মানুষের প্রাণহানীর অপেক্ষায় রয়েছে- প্রশ্ন নোয়াখালীবাসীর।

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালীতে ভূমিকম্পের আতঙ্ক নতুন নয়। নতুন আতঙ্ক হচ্ছে—ভূমিকম্প ছাড়াই ধসে পড়তে পারে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আর সেই তালিকার সবচেয়ে ভয়াবহ নাম—নোয়াখালী জেলা কারাগার। যেখানে প্রতিদিন রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন ৮২৩ জন বন্দি, ডিউটিতে থাকেন কারারক্ষীরা, আসেন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতা—সবার মাথার ওপর ঝুলছে ভঙ্গুর ভবনের নিঃশব্দ হুমকি। দেয়ালে ফাটল, বেরিয়ে থাকা মরিচাধরা রড, ছাদ থেকে ঢালাই-সহ প্লাস্টার খসে পড়া, ভাঙা গ্রিল, ঘুণে ধরা কাঠ—এগুলো শুধু “জীর্ণ দশা” নয়; সংশ্লিষ্টদের ভাষায় এগুলো দুর্ঘটনার পূর্বাভাস। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই কারাগারের ভেতরের প্রধান সড়ক ডুবে যায়, জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, সাক্ষাতের ঘরও জরাজীর্ণ। আর ভূমিকম্পের কম্পন ঘন ঘন অনুভূত হওয়ায় আতঙ্ক আরও তীব্র—কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটা বড় কম্পন লাগবে কেন? ভবন কি ভূমিকম্প ছাড়াই ধসে পড়তে পারে না?

৫৩ বছরের পুরোনো কাঠামো, ভেতরে ৮২৩ বন্দি—ঝুঁকির ভেতরেই জীবন
কারাগারটি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৭ সালে মাইজদি কোর্ট এলাকায়। পরে ১৯৭২ সালে বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, ৫৩ বছরে উল্লেখযোগ্য সংস্কার বা আধুনিকায়ন হয়নি। মোট জমি ৩৬ একর, পেরিমিটার ওয়ালের ভেতরে ৮.৫০ একর, বাইরে ২৭.৫০ একর। সরেজমিনে কারাগারের ভেতর-বাইরে দেখা যায় একাধিক ভবনে ফাটল, ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়া, রড বেরিয়ে থাকা। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই এখনো বন্দি ও কারারক্ষীদের বসবাস। জেল সুপার আবদুল বারেক জানিয়েছেন— বৃষ্টি হলেই পানি ভেতরে জমে যায়, বন্দিদের ফ্লোর ডুবে যায়, ঝুঁকি নিয়েই থাকতে হয় বন্দি ও কারারক্ষীদের। স্থানীয় সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ইমাম উদ্দিন বলছেন, সাক্ষাতের জায়গাসহ সামগ্রিক অবস্থা এতটাই জীর্ণ যে সেটা চোখেই ধরা পড়ে—এ অবস্থাকে তিনি “অত্যন্ত জরাজীর্ণ” বলে উল্লেখ করেন।

ডিসেম্বর ২০২৩ ভূমিকম্পঃ বজরা ভবন ‘রেড অ্যালার্ট’—তবু থেমে যায় গতি
ডিসেম্বর ২০২৩-এর ভূমিকম্পে কারাগারের বজরা ভবনে নতুন করে বহু ফাটল তৈরি হয়। বীম, ছাদ ও লোড বেয়ারিং দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গণপূর্ত বিভাগ দ্রুত পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বন্দি অন্যত্র সরানোর চিঠি দেয়। ঝুঁকি বিবেচনায় ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ ভবনের ২য় ও ৩য় তলা খালি করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ—এত বড় সতর্ক সংকেতের পরও সামগ্রিক পুনঃনির্মাণ/ আধুনিকীকরণের কাজ আবার আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতায় আটকে পড়ে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—একটা ভবন খালি করলেই কি দায় শেষ? পুরো কারাগার তো একই ঝুঁকিতে!

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পর্যবেক্ষণঃ “ভবন ভঙ্গুর, কিছু অংশ দেবে যাচ্ছে”
২৬-০৫-২০২৫ তারিখের পরিদর্শন প্রতিবেদনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উল্লেখ করেন—কারাগারের ভবনগুলো ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ; কয়েকটি ভবনের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যে মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে বলেও দেখা গেছে। বারবার জানানো সত্ত্বেও এখনো কারাগার পুনঃনির্মাণ সংক্রান্ত দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা—এ কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে। প্রতিবেদনটি মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব এর কাছে পাঠানো হয়। যতোদুর জানা গেছে সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও এখনো কারো টনক নড়ছেনা।

জুন ২০২৫ঃ গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর রিপোর্ট—“সামান্য ভূমিকম্পেও ধসে পড়ার সম্ভাবনা”
জুন ২০২৫-এ নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর পরিদর্শন প্রতিবেদনে বজরা, বেলাভূমি, সৈকতসহ কয়েকটি ভবনে দেয়াল-বীমে ফাটল, ছাদ থেকে ঢালাই খসে পড়ে রড দৃশ্যমান, ভাঙা গ্রিলে নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবকিছু বিস্তারিত উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়: সামান্য ভূমিকম্পে ভবনগুলো ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটতে পারে। প্রতিবেদনে রেট্রোফিটিং/ বিশেষ মেরামতের সুপারিশ থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে—এগুলো ব্যয়বহুল, এবং নতুন কারাগার নির্মাণের আগে সাময়িক সমাধান মাত্র।

২০১৭ থেকে ২০২৫: কাগজে কাগজে ৮ বছর—ডিজাইনই ফাইনাল নয়!
নোয়াখালী জেলা কারাগার পুনঃনির্মাণ/আধুনিকীকরণ নিয়ে উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। ২০১৮ সালে পরিদর্শন ও নকশা চূড়ান্তকরণের কাজ হয়। ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি খসড়া প্রাক্কলন/ প্রস্তাব তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠায়। এরপরও অভিযোগ বছরের পর বছর কেটে গেছে; কোথাও সভা, কোথাও চিঠি, কোথাও সংশোধন—কিন্তু মাঠে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি সাম্প্রতিক সভায় মাস্টারপ্লান সংশোধনের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন-প্রতিস্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও চলেছে—তবু ডিজাইন ফাইনাল নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি বলেই স্থানীয়দের অভিযোগ। নোয়াখালীবাসীর প্রশ্ন তাই আরও ধারালো—কর্তৃপক্ষ কি শত শত মানুষের প্রাণহানীর অপেক্ষায় রয়েছে? কারাগার তো শুধু ভবন নয়—এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, মানবিক দায়, আইন-শৃঙ্খলা—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।

“শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জেলা” কারাগারকে ঘিরে আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি
নোয়াখালীতে পুরোনো/ পরিত্যক্ত ঘোষিত বহু স্থাপনা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে—এ নিয়ে আগেও উদ্বেগ উঠেছে। কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থান কারাগারকে ঘিরে—কারণ এখানে মানুষ ইচ্ছেমতো বের হতে পারে না। বিপদে দ্রুত ইভাকুয়েশনও সহজ নয়। ফলে কারাগারের ঝুঁকি মানেই সম্ভাব্য ম্যাস ক্যাজুয়ালটি এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংকট।

এখনই করণীয়: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে দ্রুত ডিপিপি, দ্রুত অনুমোদন
স্থানীয় নাগরিক সমাজের বক্তব্য একটাই—প্রস্তাব নয়, বাস্তব পদক্ষেপ। বিশেষ করে— প্রকল্পটি “ফাইল-ভ্রমণ” থেকে বের করে জরুরি অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে চূড়ান্ত করা, ডিজাইন চুড়ান্ত করে দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন সম্পন্ন করা, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ না করে বিশেষ টাস্কফোর্স/ ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থা নেওয়া, ডিপিপি পাশ না হওয়া পর্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির ভবনে অস্থায়ী ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রণ, সীমিত ব্যবহার ও জরুরি মেরামত/সাপোর্ট ব্যবস্থা, কারাগারের ভেতর-বাইরে জলাবদ্ধতা নিরসনে তাৎক্ষণিক কার্যকর ড্রেনেজ ও উঁচু করণের ব্যবস্থা।

নোয়াখালী জেলা কারাগার এখন কেবল একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি এক নিঃশব্দ অ্যালার্ম। প্রতিদিন ৮২৩ বন্দির জীবন, কারারক্ষীদের নিরাপত্তা এবং একটি জেলার আইন-শৃঙ্খলার ভার এই ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটা দুর্ঘটনার পর আর কোন ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হবে না। নোয়াখালীবাসীর দাবি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদন, এবং পুনঃনির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনই দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ— ভূমিকম্প নয়, অবহেলাই যেন সবচেয়ে বড় কম্পন।

  • Related Posts

    গভীর রাতে গুলশানের দুই ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান

    রাজধানীর গুলশানে দুটি অভিজাত ক্লাবে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে গুলশানের মিডিয়া ক্লাব ও জার্মান ক্লাবে এ অভিযান শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,…

    রোহিঙ্গা-বিদেশিদের নামে ৫৫ ভুয়া জন্মসনদ তৈরি, কর্মকর্তার দাবি ‘ফাঁসানো হচ্ছে’

    ডেস্ক নিউজ : গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রোহিঙ্গাসহ বিদেশি নাগরিক ও অস্তিত্বহীন ব্যক্তিদের নামে ৫৫টি জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়নের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় কঠোরতা প্রশাসনের

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১৬, ২০২৬
    • 0 views
    সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় কঠোরতা প্রশাসনের

    দেশের ২৭২৭ পূজামণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন, দুর্গম এলাকায় ২১ বেস ক্যাম্প

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১৬, ২০২৬
    • 4 views
    দেশের ২৭২৭ পূজামণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন, দুর্গম এলাকায় ২১ বেস ক্যাম্প

    ‘কর্মসংস্থান ও শিল্প চাহিদার সামঞ্জস্যে পূর্ণাঙ্গ টিভেট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বাংলাদেশ’

    • By admin admon
    • অক্টোবর ১৬, ২০২৬
    • 6 views
    ‘কর্মসংস্থান ও শিল্প চাহিদার সামঞ্জস্যে পূর্ণাঙ্গ টিভেট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বাংলাদেশ’

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    সৌদির আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, হুতির হুঁশিয়ারি

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি শুরু

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

    শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ