অ্যান্টিবায়োটিকে নেই অ্যামোক্সিসিলিন: এলবিয়নের ওষুধে ‘মানবহির্ভূত’ উপাদান, জনস্বাস্থ্য আতঙ্ক

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের ওষুধ বাজারে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য সামনে এসেছে। জাতীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে—একটি অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে মূল উপাদান অ্যামোক্সিসিলিনের অস্তিত্বই নেই। পরিবর্তে সেখানে পাওয়া গেছে অজানা সাদা দানাদার পাউডার, যা ল্যাব প্রতিবেদনে সরাসরি “মানবহির্ভূত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH)-এর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিমক্স ৫০০ এমজি (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলের ব্যাচ নম্বর ০১১২১২ পরীক্ষায় দেখা গেছে—ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন নেই, বরং রয়েছে অজানা সাদা পাউডার। ক্যাপসুলের গড় ওজন পাওয়া গেছে ৩৯০.২ মি.গ্রা।

 

 

ল্যাব প্রতিবেদনের ভাষায়—
“ইহা মানবহির্ভূত। অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি।” এই তথ্য প্রকাশের পর জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ চিকিৎসকরা যে ওষুধ রোগীদের দিচ্ছেন, সেখানে যদি মূল অ্যান্টিবায়োটিকই না থাকে, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, রোগীর জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ইনডোমেথাসিনেও গুরুতর ঘাটতি : শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, ব্যথানাশক ওষুধেও ধরা পড়েছে বড় ধরনের অমিল। পরীক্ষায় ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলে ঘোষিত মাত্রা ২৫ মি.গ্রা হলেও পাওয়া গেছে ২৪.১১ মি.গ্রা ও ২২.৫৯ মি.গ্রা, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য : নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাঈম গোলদার বলেন, “যথাযথ প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন জানান, “নমুনা সংগ্রহ করে নতুন করে আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে।”

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—
জাতীয় পরীক্ষাগারে অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিন নেই—এটাই কি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়?

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ছায়ায় ‘এসপ্রিন’ : অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ওষুধ ডিসপ্রিন বন্ধ হলেও এলবিয়ন বাজারে এনেছে প্রায় একই ধরনের একটি ওষুধ—‘এসপ্রিন’ ট্যাবলেট।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই ট্যাবলেট পানিতে দ্রবীভূতই হয় না, যা এর কার্যকারিতা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এলবিয়নের বিরুদ্ধে নিম্নমান ও আন্ডাররেট বাণিজ্যের অভিযোগ :
চট্টগ্রামের রহমতনগর, সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর: জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১) দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও আন্ডাররেট ওষুধ বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, লেবেলে মুদ্রিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে পাইকারি বাজারে। যেমন— ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা) — ২০০ টাকার বক্স বিক্রি ৬৫ টাকায়, প্যানটোপ্রাজল-২০ — ২১০ টাকার বক্স বিক্রি ৭০ টাকায়, ডাইক্লোফেনাক SR — ৩০০ টাকার বক্স বিক্রি ৯০ টাকায়, সেটিরিজিন — ২৫০ টাকার বক্স বিক্রি ৭০ টাকায়, ডেসলোরাটাডিন — ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি ৯৫ টাকায়, ডেক্সামেথাসন — ২০০ টাকার বক্স বিক্রি ৬৫ টাকায়, ক্যালসিয়াম-ডি — ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি ৯৫ টাকায়, লটিল-২০ — ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি ১০০-১১০ টাকায় লটিল-৪০ — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি ৯০ টাকায়, নাইট্রাম — ১০০ টাকার বক্স বিক্রি ৩০ টাকায়, টলসিড — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি ১১০-১২০ টাকায়, ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস — ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি ১৪০-১৫০ টাকায়।

এসব ওষুধ রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার হাজী রানী মেডিসিন মার্কেটের একটি পাইকারি দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারী জানিয়েছেন।

একই এমএ নম্বর দুই ওষুধে: আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—
সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা এবং ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা—এই দুই ভিন্ন ওষুধে একই এমএ নম্বর ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

অতীতেও ছিল নিষেধাজ্ঞা : ২০০৮ সালে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি এলবিয়নের চারটি ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত সাময়িক স্থগিত করেছিল।
সেগুলো হলো— ডাইক্লোফেনাক TR ক্যাপসুল, ডি-ক্যাপসুল (ডক্সিসাইক্লিন), গ্লাইসোফুলভিন ট্যাবলেট, এলফ্লাম (আইবুপ্রোফেন), ২০০৯ সালে আবারও পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) নিম্নমানের হওয়ায় উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করা হয়। সিল হয়েছিল কারখানাও। চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করেছিল। পরে DGDA-এর অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করা হয়।

তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—
মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, GMP লঙ্ঘন, নিম্নমানের ওষুধ, আগেও কারখানা সিল। এসব ঘটনার পরও এলবিয়ন কীভাবে নিয়মিত উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে?

বড় প্রশ্ন: এতদিন কী করছিল ঔষধ প্রশাসন ? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে—“DGDA আরও আগেই ব্যবস্থা নিলে বাজারে নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটত না।” প্রতিবছর সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও, যদি বাজারে মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক ঘুরে বেড়ায়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় নয়— এটি পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এখন প্রশ্ন একটাই— দেশের মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মান নিশ্চিত করতে প্রশাসন কি কঠোর পদক্ষেপ নেবে, নাকি বাজারে ‘ভেজাল ওষুধের সাম্রাজ্য’ চলতেই থাকবে?

  • Related Posts

    সমঝোতার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, SK+F-এর ওষুধ কেনাবেচা বন্ধের হুঁশিয়ারি কেমিস্টদের

    বিশেষ প্রতিবেদক : স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান SK+F- এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কেমিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৈঠকে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না…

    শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

    কক্সবাজারের টেকনাফে ক্রসফায়ারে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ চার আসামিকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় পলাতক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি, শুরুতে ইউপি নির্বাচন

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 7 views
    নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি, শুরুতে ইউপি নির্বাচন

    সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশা গ্রেপ্তার

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশা গ্রেপ্তার

    পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের প্রাচীনতম প্রশিক্ষণকেন্দ্র দখল করল ইসরায়েলি বাহিনী

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 7 views
    পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের প্রাচীনতম প্রশিক্ষণকেন্দ্র দখল করল ইসরায়েলি বাহিনী

    পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা এলাকায় আঘাত হানে ভারতের ড্রোন

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 5 views
    পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা এলাকায় আঘাত হানে ভারতের ড্রোন

    পাবনায় অস্ত্রোপচারের পর ১১ জনের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত, বেশির ভাগই প্রসূতি

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    পাবনায় অস্ত্রোপচারের পর ১১ জনের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত, বেশির ভাগই প্রসূতি

    এশিয়া কাপের আগে বিপদে বাংলাদেশ

    • By Sara
    • আগস্ট ২৫, ২০২৬
    • 6 views
    এশিয়া কাপের আগে বিপদে বাংলাদেশ