গণপূর্তের ‘ডন’ কামরুপ কামরুল: মূতা বিয়ে, নারী কেলেঙ্কারি ও টেন্ডার সিন্ডিকেটে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো যেন কোনো সাধারণ দুর্নীতির গল্প নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী কেলেঙ্কারি ও টেন্ডার কারসাজির এক জটিল চিত্র। হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী এবং নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছান, যিনি অনেকের কাছে ‘কামরুপ’ নামে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

মোঃ কামরুল হাছান (৫০), পিতা মৃত মোঃ রেয়াজ উদ্দীন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গৌরিপুরের কড়িকান্দি গ্রামে। তিনি ২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর তিনি সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান এবং ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে প্রথম নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন পান নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত। তার স্ত্রী ডা. জান্নাতুল মাওয়া টুম্পা (৪৯) পিরোজপুর জেলার একজন পরিচিত গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বর্তমানে পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি কেয়ার ফাস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও নিয়মিত রোগী দেখেন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে—কন্যা আদিবাতুন নাবিহা (১৩) এবং পুত্র আব্দুল্লাহ আল নাবহান (১৪)। পারিবারিকভাবে তার ছোট ভাই ডা. মুক্তার হোসেন নাসের ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত এবং ছোট বোন রিনা তার স্বামীর সাথে চট্টগ্রামে বসবাস করেন।

তবে কর্মজীবনে তার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে নোয়াখালীতে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে। সাধারণত একজন নির্বাহী প্রকৌশলী একটি জেলায় দুই থেকে তিন বছরের বেশি থাকেন না। কিন্তু কামরুল হাছান নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আত্মীয় হওয়ার কারণে তিনি সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে সক্ষম হন।

এই সময়েই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে আসে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতেও আসে। পরে তাকে নোয়াখালী থেকে সরিয়ে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন করা হয়।

কামরুল হাছানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো তথাকথিত ‘মূতা বিয়ে’ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নোয়াখালীতে কর্মরত অবস্থায় নিম্নবিত্ত ও অসহায় পরিবারের তরুণীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর ওই নারীদের অর্থ দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হতো। স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, নোয়াখালীতে থাকার সময় তিনি দুই দফায় প্রায় চল্লিশটিরও বেশি এ ধরনের মূতা বিয়ে করেছিলেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ঠিকাদার তার জন্য এসব ব্যবস্থাপনা করতেন এবং বিনিময়ে তারা বড় বড় সরকারি কাজ পেতেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘ম’ অদ্যাক্ষরের এক ঠিকাদার এই কাজে প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করতেন এবং তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়েছে।

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী মূতা বিয়ে বহু আগেই নিষিদ্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশেও এর কোনো আইনি বৈধতা নেই। তাই প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে এমন কর্মকাণ্ডকে অনৈতিক ও বেআইনি হিসেবে দেখা হয়।

এদিকে নোয়াখালীর মাইজদী এলাকার একটি ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফকিরপুরের রশিদ কলোনীতে এক কিশোরীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের পর মেয়েটির গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে কামরুলকে মারধর করেন। পরে স্থানীয় এক ঠিকাদারের ক্লিনিকে ওই কিশোরীর চিকিৎসা করানো হয়।

নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অধস্তন কর্মচারীর স্ত্রীসহ একাধিক নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। পটুয়াখালীতে কর্মরত থাকাকালে তার অধীনস্থ এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীর স্ত্রী ঝুমুরের সাথে সম্পর্কের ঘটনাও আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে ওই প্রকৌশলী বিষয়টি জানতে পেরে স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটান।

নোয়াখালীতে থাকার সময় ঝুমুরের জন্য আলাদা বাসার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, একসময় তাদের অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এলে কামরুল হাছান স্থানীয়দের রোষানলেও পড়েন।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে সম্বন্ধীর স্ত্রীর সাথেও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারী পেশায় একজন নার্স এবং তিনি প্রায়ই নোয়াখালীর সরকারি বাংলোতে আসতেন।

নারী কেলেঙ্কারির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে গুরুতর টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। নোয়াখালীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি একটি শক্তিশালী কমিশন সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো ঠিকাদার কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয় ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন।

২০২০ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে তিনি একই ঠিকাদারকে ধারাবাহিকভাবে একাধিক কাজ প্রদান করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক টেন্ডারে মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়েছিল এবং সেই একই প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এমনকি একই দিনে ছয়টি টেন্ডারে একই প্রতিষ্ঠানের বিজয়ী হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণ কাজের টেন্ডারেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা কমিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালে একই কাজের বিপরীতে দুইবার বিল দিয়ে ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। হাতিয়া মডেল মসজিদ প্রকল্পেও কাজ না করেই বিল প্রদানের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, তিনি ব্যক্তিগত খরচের ক্ষেত্রেও ঠিকাদারদের উপর নির্ভর করতেন। এমনকি পেট্রোল পাম্প ও বিভিন্ন দোকানে তার বিপুল বকেয়া থাকার কথাও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নোয়াখালীতে থাকার সময় তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি অর্থের যোগান দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

পরবর্তীতে বরিশালে বদলি হওয়ার পরও তিনি নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

সব মিলিয়ে মোঃ কামরুল হাছানকে ঘিরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী কেলেঙ্কারি ও টেন্ডার কারসাজির যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 4 views
    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 8 views
    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী