যমুনা অয়েলে দ্বৈত নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার: বরখাস্ত মিল্টন, ধরাছোঁয়ার বাইরে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ ৪ মার্চ “যমুনা অয়েলে দ্বৈতনীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচআর ও ডিপো ইনচার্জ” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনের ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ৫ মার্চ তড়িঘড়ি করে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে আলোচিত কর্মচারী অফিস সহকারী হোসাইন মো. ইসহাক মিল্টনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদুল ইসলাম এবং বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মো. সাদেকিনের সমন্বয়ে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। ইসহাক মিল্টন দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারী হওয়ায় “নো ওয়ার্ক নো পে” নীতির আওতায় মৌখিক নির্দেশেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এক মাস সতের দিন জেল হাজতে থাকার পরও কীভাবে ওই কর্মচারী আবার স্বাভাবিকভাবে চাকরিতে যোগদান করতে পারলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই পুরো ঘটনায় মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এবং সংশ্লিষ্ট ডিপো ইনচার্জের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি, এমনকি কোনো ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটিতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও জেল হাজতে থাকা কর্মচারীর নামে ছুটির আবেদন গ্রহণ ও তা মঞ্জুর করার নজির রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বর্তমান জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম।

২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. মাসুদুল ইসলাম। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। মার্কেটিং কিংবা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে কোনো ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় বিকম তৃতীয় শ্রেণি এবং কেবলমাত্র চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির কোর্স সম্পন্ন করলেও তিনি বর্তমানে একসঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ), মহাব্যবস্থাপক (বিপণন), কোম্পানি সচিব, বিটুমিন সরবরাহ কমিটির দায়িত্ব এবং অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি কিছুদিন তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্বও পালন করেছেন।

যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে তার জন্য পৃথক তিনটি চেম্বার রয়েছে এবং কর্মকর্তাদের চেম্বার বণ্টনের দায়িত্বও তার হাতেই। অভিযোগ রয়েছে, সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহির আশীর্বাদেই প্রতিষ্ঠানে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করেন তিনি। পরবর্তীতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আমির মাসুদ দায়িত্ব গ্রহণের পরও তার ক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এদিকে ২০১৬ সালে যমুনা অয়েলের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পায় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি আবারও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পান এবং ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত কর্মকর্তা শেখ জাহিদ আহমেদকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলির ক্ষেত্রেও মাসুদুল ইসলামের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিজিএম (এইচআর) মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরে তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এতদিন তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ছিল মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

বরখাস্ত হওয়া সিবিএ নেতা আবুল হোসেন, যিনি যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি এবং নিষিদ্ধ সংগঠন জাতীয় শ্রমিকলীগ বন্দর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক। তার বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, ২১ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত তিনি বিশেষাধিকার ছুটি ভোগ করেছেন এবং পরে অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ তথ্য অনুযায়ী, কোতোয়ালী থানার জি আর মামলা নম্বর ৪১৫/২০২৫–এ তাকে ২১ জুলাই গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে অপর সিবিএ নেতা এয়াকুবের ক্ষেত্রেও।

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—যেদিন তারা গ্রেফতার হলেন, সেদিন থেকেই কীভাবে তাদের ছুটি মঞ্জুর হলো। পুলিশ হেফাজতে থেকে তারা কীভাবে ছুটির আবেদন করলেন—তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাসুদুল ইসলাম নিজেই তাদের স্বাক্ষর জাল করে ছুটির আবেদন তৈরি করেন এবং পরে নিজেই তা অনুমোদন দেন।

এদিকে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মচারীদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট তার স্বাক্ষরে প্রকাশিত পদোন্নতির তালিকায় কুতুবউদ্দিন হোসেনসহ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মচারী পদোন্নতি পান। কুতুবউদ্দিন নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আজম নাসিরের আত্মীয় বলে জানা গেছে। এছাড়া সহীদুল আলম, শেখ কামাল, ইকরাম ও মীর আরিফসহ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়।

ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় পৌনে চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অভিযোগকারীরাই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েন। ফতুল্লা ডিপোর অফিসার (অপারেশন) ইমরান হোসেন তেল চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পর তাকে ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকা বিভাগীয় বিক্রয় অফিসে বদলি করা হয়।

এর আগে ২০২০ সালে মংলা অয়েল ইনস্টলেশন ডিপোতে প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ লিটার তেলের অস্বাভাবিক ক্ষতির ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ভালো পোস্টিং দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক নয়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থ শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিনিয়োগ করে প্রায় চার কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতির ঘটনায় ২০১৬ সালে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।

১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর যমুনা অয়েলে চাকরি শুরু করা মাসুদুল ইসলাম চাকরি জীবনে একাধিকবার গাড়ি কেনার ঋণ নিয়েছেন। এমনকি ২০ লাখ টাকার গাড়ি ঋণ নিয়ে গাড়ি না কিনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার অভিযোগও ওঠে। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তিনি সেই অর্থ ফেরত দেন।

বর্তমানে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় তার একটি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাকলিয়া আবাসিক প্রকল্পে দুটি প্লট, একটি ডেইরি ফার্ম এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ায় তার সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 4 views
    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 8 views
    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী