বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট সরবরাহ ঘিরে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং উচ্চমূল্যের অভিযোগ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। এ বাস্তবতায় সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগ নেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। বাজার বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ড যাচাই করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি যৌক্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক স্পেসিফিকেশন (সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা) নির্ধারণের সুপারিশ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল—দরপত্রে অধিকসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অযৌক্তিক শর্ত শিথিল করা এবং বাস্তব বাজারদর প্রতিফলিত করা।
কিন্তু নথিপত্র বলছে ভিন্ন গল্প। কমিটির সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিজস্বভাবে স্পেসিফিকেশনে সংযোজন-বিয়োজন করে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেয়, যা কার্যত প্রতিযোগিতা সীমিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সেই সংশোধিত প্রস্তাবই অনুমোদন করে। ফলে যে উদ্যোগে বাজার উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল, সেটিই উল্টো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—লিফট ক্রয়ের মানদণ্ড কি আবারও নির্দিষ্ট দু-একটি কোম্পানির অনুকূলে সাজানো হলো? সংশ্লিষ্টদের মতে, কঠোর ও বাছাইকৃত শর্তের এ কাঠামো দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতাহীন করে তুলতে পারে, যেখানে সুবিধা পেতে পারে দু-একজন প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারী।
নথিপত্র বলছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েরে অতিরিক্ত সচিবকে (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে সদস্য হিসেবে রাখা হয় বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও গণপূর্তের ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে।
কমিটির পর্যালোচনা বলছে, লিফট সরবরাহকারী অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ক্রয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে এবং উচ্চদর দাখিল করছে। লিফট সরবরাহে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কম হওয়া এবং উচ্চমূল্যে দাখিল করার অন্যতম কারণ হিসেবে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দর তপশিলে স্পেসিফিকেশনে কঠিন শর্তারোপ থাকায় প্রতিযোগিতা কম হচ্ছে এবং কাস্টমস ডিউটি ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় লিফটের মূল্যে অধিক উদ্বৃত করা হচ্ছে। তাই দর তপশিলের স্পেসিফিকেশনে যৌক্তিক পরিবর্তন ও দরপত্র আহ্বানের প্রাক্কালে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য প্রণয়নের সময় বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটির হার ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় মূল্য ধরে ব্যয় প্রাক্কলন করা হলে ওই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কমিটির পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দপ্তর তপশিলে লিফটের চারটি টাইপ রয়েছে। টাইপ ‘এ’-তে সাতটি ব্র্যান্ডের কথা বলা হয়েছে এগুলো হলো—কো-নে (ফিনল্যান্ড), মিৎসুবিশি (জাপান), ওটিআইএস (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স), শিন্ডলার (সুইজারল্যান্ড), টিকেই (জার্মানি), ফুজিটেক (জাপান) ও হিটাচি (জাপান)। ‘এ’ টাইপের লিফটের স্পেসিফিকেশনে বলা হয়েছে, কোম্পানিগুলোর বহুমাত্রিক-মহাদেশীয় উৎপাদন কেন্দ্র থাকতে হবে এবং ন্যূনতম ১০ মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের লিফট উৎপাদন সক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির উৎপাদন অভিজ্ঞতা ন্যূনতম ৬৫ বছর হওয়ার শর্ত রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দপ্তর তপশিলে লিফটের টাইপ ‘বি’-এর ক্ষেত্রে চারটি ব্র্যান্ডের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হলো—ভিটুর (জার্মানি), অরোনা (স্পেন), ম্যাকপুয়ারসা (স্পেন) ও মভি (ইটালি) ‘বি’ টাইপের লিফটের স্পেসিফিকেশন বলা হয়েছে, কোম্পানির ন্যূনতম ৪ মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের উৎপাদন সক্ষমতা এবং ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দপ্তর তপশিলে লিফটের টাইপ ‘সি’তে ছয়টি ব্র্যান্ডের লিফট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো—কো-নে যথা: কো-নে (চীন), মিৎসুবিশি (থাইল্যান্ড/চীন), ওটিআইএস (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া), শিন্ডলার (চীন), টিকেই (চীন/দক্ষিণ কোরিয়া), হিটাচি (চীন)। ‘সি’ টাইপের লিফটের স্পেসিফিকেশনে বলা হয়েছে, কোম্পানির বহুমাত্রিক-মহাদেশীয় উৎপাদন কেন্দ্র এবং ন্যূনতম তিন মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের লিফট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হবে। এ ছাড়া লিফট উৎপাদনে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে ন্যূনতম ২৫ বছর। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের ক্ষেত্রে একই ব্র্যান্ডের উৎপাদন অভিজ্ঞতা ন্যূনতম ৬৫ বছর এবং ১০ মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের উৎপাদন সক্ষমতা থাকতে হবে।
তপশিলে ‘ডি’ টাইপ লিফটের ক্ষেত্রে ১৮টি ব্র্যান্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—এসআরএই (চীন), শি-জি ইউনাইট (চীন), ফুজি এইচডি (চীন), মাশিবা (মালয়েশিয়া), তোশিবা (থাইল্যান্ড), নিডেক (চীন), সিগমা (চীন), শি-নাই-দ্য (চীন), অক্স (চীন) জাপান স্যানিও (চীন), বেস্টার (চীন), শিন্ডলার (ভারত), কো-নে (ভারত), মিৎসুবিশি (ভারত), ওটিআইএস (ভারত), হিটাচি (ভারত), ফুজিটেক (ভাতর) ও টিকেই (ভারত)।
‘ডি’ টাইপের স্পেসিফিকেশনে বলা হয়েছে, এসব কোম্পানির ন্যূনতম ৩ মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের উৎপাদন সক্ষমতা এবং ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি লিফট সরবরাহে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমাতে এবং যুগোপযোগী করতে বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে। পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান ই/এম দর তপশিলের চারটি টাইপের লিফটের স্পেসিফিকেশন পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লিফটের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়।
বাজারে প্রাপ্ত লিফটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, অধিকাংশ লিফট চীন থেকে আমদানিকৃত। তবে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানে উৎপাদিত কিছু সংখ্যক লিফটও বাজারে রয়েছে। কিন্তু বাজারে প্রচলিত অল্প সংখ্যক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লিফট উৎপাদন অভিজ্ঞতা ৬৫ বছর রয়েছে। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান ই/এম দর তপশিলে টাইপ ‘এ’ লিফটের ক্ষেত্রে উৎপাদন অভিজ্ঞতা ৬৫ বছর উল্লেখ রয়েছে। সে কারণে লিফট ক্রয়ে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে লিফট ক্রয়ে অধিকতর প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দর তপশিলভুক্ত লিফট ‘এ’-টাইপে অন্তর্ভুক্ত ন্যূনতম ৬৫ বছর উৎপাদন অভিজ্ঞতা কমিটির কাছে অধিক বলে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া ‘এ’ টাইপ লিফটের জন্য ১০ মিটার বা সেকেন্ড স্পিডের উৎপাদন সক্ষমতার কথা উল্লেখ থাকলেও এগুলোর বিস্তারিত কারিগরি বিবরণে ৪ মিটার বা সেকেন্ডের অধিক স্পিডের লিফট গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম দর তপশিলে অন্তর্ভুক্ত নেই। অথচ বিএনবিসি-২০২০ এ লিফটের সর্বোচ্চ স্পিড ৫ মিটার বা সেকেন্ড উল্লেখ রয়েছে।
এজন্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সার্বিকভাবে ভবনের উচ্চতা ও ব্যবহার অনুযায়ী ‘এ’ টাইপের লিফট উৎপাদন কোম্পানির সক্ষমতার মাপকাঠিতে ন্যূনতম ১০ মিটার বা সেকেন্ড স্পিড কমিটির কাছে অধিক প্রতীয়মান হয়েছে। তাই কমিটি কোম্পানির উৎপাদন অভিজ্ঞতা ৬৫ বছরের পরিবর্তে ৪০ বছর এবং ন্যূনতম স্পিড ১০ মিটার বা সেকেন্ড কমানোর বিষয়ে সুপারিশ করে।
সুপারিশে আরও বলা হয়—‘ডি’ টাইপের ক্ষেত্রে ৫ মিটার থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত ভবনের উচ্চতায় বাংলাদেশে তৈরি কিংবা বাংলাদেশে সংযোজন লিফট নেওয়া যাবে। তবে শর্ত থাকবে, গতি হবে ৩ মিটার বা সেকেন্ড এবং লিফট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা হতে হবে তিন বছর।
‘সি’ টাইপের ক্ষেত্রে ৫ মিটার থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে যে কোনো দেশে উৎপাদিত লিফট সরবরাহ করা যাবে। তবে গতি হতে হবে ৩ মিটার বা সেকেন্ড এবং লিফট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা হতে হবে ১৫ বছর।
‘বি’ টাইপের ক্ষেত্রে ২০ মিটারের অধিক থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে যে কোনো দেশে উৎপাদিত লিফট হলেই হবে। তবে কোম্পানির বহুমাত্রিক-মহাদেশীয় উৎপাদন কেন্দ্র থাকতে হবে। গতি হতে হবে ৪ মিটার/সেকেন্ড। মূল উৎপাদন কেন্দ্রের বয়স ৪০ বছর এবং ভিন্ন মহাদেশে অবস্থিত উৎপাদন কেন্দ্রের বয়স ২০ বছর হতে হবে।
‘এ২’ টাইপের ক্ষেত্রে ৩০ মিটারের বেশি হতে ১০০ মিটার পর্যন্ত ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের লিফট হতে হবে। তবে কারিগরি বিবেচনায় এমন কোনো কোম্পানি বা উৎপাদন কেন্দ্র নির্ধারণ করা যাবে না, যার ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব লিফটের গতি হতে হবে ৪ মিটার/সেকেন্ড। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা হতে হবে ৪০ বছর।
‘এ১’ টাইপের ক্ষেত্রে ১০০ মিটারের অধিক উচ্চতার ভবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ হতে হবে। তবে কারিগরি বিবেচনায় এমন কোনো কোম্পানি বা উৎপাদন কেন্দ্র নির্ধারণ করা যাবে না, যার ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গতি হতে হবে ১০ মিটার/সেকেন্ড। লিফট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা হতে হবে ৪০ বছর।
সুপারিশে আরও বলা হয়, হাসপাতাল ভবনের ক্ষেত্রে সুপারিশ ‘এ২’ টাইপ লিফট নির্বাচন করা যেতে পারে। তবে আর্থিক সংস্থান এবং বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় লিফটের টাইপ নির্বাচন করা যেতে পারে।
তবে নথি বলছে, মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির এসব সুপারিশ গণপূর্ত অধিদপ্তর কাটাছেঁড়া করে নিজেদের মতো করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এমনকি ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী লিফট সরবরাহের সুপারিশ করা হলেও বিষয়টি আমলেই নেয়নি গণপূর্ত। গণপূর্ত সূত্র বলছে, এতে ঘুরেফিরে হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি লাভবান হবে। কারণ যে ধরনের স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, তা ওই দু-একটি কোম্পানির সঙ্গেই মিলবে। উচ্চতার ভিন্নতা না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছোট ছোট কোম্পানি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাস করা নতুন তপশিলে দেখা গেছে, ‘এ১’ লিফটের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কমিটির সুপারিশে প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন করা নথিতে দেখা যায়, প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সুপারিশে বলা হয়, কারিগরি বিনির্দেশে এমন কোনো টেকনোলজি বা ম্যাটারিয়ালস সুনির্দিষ্ট করা যাবে না, যার কারণে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে অনুমোদন দেওয়া নথিতে নানা ধরনের শর্ত দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে; উল্লেখ করা দেওয়া হয়েছে নানা ধরনের সার্টিফিকেটের কথাও। এ ছাড়া সুপারিশে উৎপাদন কেন্দ্রের (ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট) বয়স ৪০ বছরের কথা বলা হলেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সর্বনিম্ন ৩০ বছর।
একইভাবে সুপারিশে ‘এ২’ টাইপের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী কোম্পানির বয়স ৪০ বছর উল্লেখ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাস করা নথিতে উল্লেখ রয়েছে কোম্পানির বয়স হতে হবে ৩০ বছর। পাশাপাশি নানা ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
‘বি১’ টাইপ লিফটের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কমিটির সুপারিশ রয়েছে যে কোনো দেশের কোম্পানি এই লিফট সরবরাহ করতে পারবে। তবে বিভিন্ন মহাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র থাকতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে এখানে দেশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লিফটটি যুক্তরাষ্ট্র/যুক্তরাজ্য/জাপান/ইইউভুক্ত দেশগুলোতে উৎপাদিত হতে হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত লিফট প্রস্তুতকারী কোম্পানির কারখানা প্রাঙ্গণে নিজস্ব টেস্টিং টাওয়ার এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) শাখা বা কেন্দ্র থাকতে হবে। এ ছাড়া কোম্পানিটি নিজস্ব কারখানায় কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, মাদারবোর্ড এবং সব পিসিবি (প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড) উৎপাদন করে। পার্মানেন্ট ম্যাগনেট সিঙ্ক্রোনাস (পিএমএস) টাইপ গিয়ারলেস মোটর এবং ডোর ইনভার্টার তৈরি করে। প্রস্তাবিত লিফট প্রস্তুতকারী কোম্পানির প্রস্তাবিত লিফট মডেলের সম্পূর্ণ লিফটের জন্য টিইউভি/ডিএনভি সনদ থাকতে হবে এবং লিফটটি TUV/SUD/Liftinstituut/Intertek/UL/Eurocert S.A/IMQ/DEKRA/CSA Group/Kayra Certification কর্তৃক প্রত্যয়িত প্রধান অংশগুলো দিয়ে গঠিত হতে হবে। এ ছাড়া নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বয়স ৪০ বছর এবং ভিন্ন মহাদেশে প্লান্ট থাকলে তার বয়স ২০ বছরের শর্তের কথা বলা হয় মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাস করা নথিতে ৩০ বছরের কথা বলা হয়।
‘সি’ টাইপের ক্ষেত্রে সুপারিশে বলা হয়, বাংলাদেশে উৎপাদিত কিংবা সংযোজন করা কোম্পানি সরবরাহ করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তাদের চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে তিন বছরের অভিজ্ঞতার কথা।
তথ্য বলছে, দীর্ঘ বছর ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরে লিফট সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেটকে পরিচালনা করে গণপূর্ত অধিপ্তরেরর কয়েকজন অসাধু প্রকৌশলী। ফলে এই নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ লিফট সরবরাহ করতে পারেন না। কারণ টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে লিফট সরবরাহে নানা শর্ত আরোপ করা হয়। এসব শর্ত ওই নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া অন্যরা কেউ পূরণ করতে পারে না। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হলে তারা লিফট সরবরাহের সিন্ডিকেট ভাঙতে একটি কমিটি গঠন করে দেয়। কিন্তু সেই কমিটির সুপারিশকেও আমলে না নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো শর্ত আরোপ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠান প্রকৌশলীরা।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র বলছে, লিফট সরবরাহে বেশ কয়েকটি দেশীয় কোম্পানিও রয়েছে, যারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে লিফট উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে উন্নতমানের লিফট সামগ্রী এনে সংযোজনও করছে কয়েকটি কোম্পানি। লিফট আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহকে কেন্দ্র করে অনেক উদ্যোক্তাও গড়ে উঠেছে সারা দেশে। এক্ষেত্রেও উল্টো পথে হেঁটেছে গণপূর্ত। নির্দিষ্ট দু-একটি কোম্পানিকে আমলে নিয়ে তাদের পক্ষেই নানা শর্ত আরোপ করেছে সংস্থাটি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে থেকে কোনো বিষয়ে কাগজ এলে তাতে যা উল্লেখ থাকে, তার বাইরে কোনো কিছু করা হয় না। কিছু বিষয় কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়।’
মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ মোহাম্মদ মমিনুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব পণ্য আনা হয় তার কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একই ধরনের পণ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে হয়ে থাকে। তাই যেসব পণ্য আনার কথা; সেগুলো ঠিকমতো আসছে কি না, তা নিশ্চিতে পরীক্ষা করতে হয়। উচ্চতা অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন হয় কি না তাও দেখতে হয়।’
সুপারিশ পরিবর্তন করে নিজেদের মতো স্পেসিফিকেশন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।









