দুদক কমিশনার পদে নিয়োগের গুঞ্জনের মধ্যে আবারও আলোচনায় সাবেক কাস্টমস কমিশনার হাফিজুর রহমান

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সাবেক কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকার কমিশনার মো. হাফিজুর রহমানকে ঘিরে আবারও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন। কারণ ড. আব্দুল মোমেনের মতো চরম দুর্নীতিবাজ আমলা দুদকের চেয়ারম্যান হতে পারলে তবে তিনিও হতে পারবেন বলে মনে করেন।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের অক্টোবরে দুর্নীতির অভিযোগে বিসিএস (কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সরকারি চাকরিতে থেকে ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িত থাকা এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

পরবর্তীতে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তদন্তে ছুটি শেষে যথাসময়ে কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অর্জন এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।

এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুদক তার নিজের, স্ত্রী ও নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে কিংবা বেনামে অর্জিত সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করে। নোটিশে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। এজন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের বিবরণ, আয়ের উৎস, দায়-দেনা ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র কমিশনে জমা দিতে বলা হয়।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন, হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে স্থগিত ছিল। আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর পুনরায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর একটি তদন্তেও তার বিরুদ্ধে একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান বেস্ট লজিস্টিকস লিমিটেড-এর ৭৫ শতাংশ মালিকানার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে অভিযোগ ওঠে, সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মেয়ের সঙ্গে কেলেঙ্কারির ভিডিও ফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে হাফিজকে বরখাস্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ৭৫ শতাংশ মালিকানা তার নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং অবৈধ অর্থে বিপুল পরিমাণ এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বৈরাচার সরকারের অর্থমন্ত্রী লোটাস কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল এবং দুদকের তৎকালীন কমিশনার, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ২০ কোটি টাকা দিয়ে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে চাকরি ফেরত পান।

এছাড়া নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলার কার্যক্রমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসে। ওই মামলায় এনবিআরের আপিল খারিজ হওয়ার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কাস্টমস বিভাগের দুই কর্মকর্তা এবং একজন আইনজীবীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হাফিজুর রহমানকে ঘিরে আরও নানা অভিযোগ প্রচারিত হচ্ছে। এসব দাবিতে বলা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার ভাতিজা হিসেবে পরিচয় দিতেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ মাহবুব আরা গিনি এবং শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী সেলিমা আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রভাব ব্যবহার করে তিনি কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থল ঢাকা বন্ড কমিশনার পদে নিয়োগ পান। দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। এছাড়া ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটি বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশের ঘটনাও সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিভিন্ন মহলে আরও দাবি করা হচ্ছে, চাকরি হারানোর পরও হাফিজুর রহমান প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বর্তমানে দুদকের কমিশনার পদে নিয়োগ পাওয়ার লক্ষ্যে তদবির চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে মো. হাফিজুর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

  • Related Posts

    বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের পিডির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

    নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. শফিকের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ…

    পূর্ব রেলের সংকেত বিভাগে টেন্ডার অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, কেন্দ্রে প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে টেন্ডার কার্যক্রম, বিল অনুমোদন এবং কমিশন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের পিডির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 7 views
    বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ বিভাগের পিডির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

    নাহিদ রানা ঢাকায়, তাসকিনের জন্য কী ‘ওষুধ’ অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকের

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 4 views
    নাহিদ রানা ঢাকায়, তাসকিনের জন্য কী ‘ওষুধ’ অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকের

    রোববারে তিন উপজেলার বন্যাদুর্গতদের খোঁজ নিতে চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 5 views
    রোববারে তিন উপজেলার বন্যাদুর্গতদের খোঁজ নিতে চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

    অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে: বিদ্যুৎ বিভাগ

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 4 views
    অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে: বিদ্যুৎ বিভাগ

    রাশিয়ার সমুদ্রসৈকতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, হতাহত ৪৭

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 3 views
    রাশিয়ার সমুদ্রসৈকতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, হতাহত ৪৭

    ভারত সীমান্তে ২৫০টি অত্যাধুনিক চীনা যুদ্ধযান মোতায়েন করলো পাকিস্তান

    • By Reporter
    • আগস্ট ৩, ২০২৬
    • 5 views
    ভারত সীমান্তে ২৫০টি অত্যাধুনিক চীনা যুদ্ধযান মোতায়েন করলো পাকিস্তান